নিখোঁজের ১৩ বছরেও ফেরেননি হনুফা, মেয়ের অপেক্ষায় বৃদ্ধ মা-বাবা
প্রায় ১৩ বছর ধরে মেয়ের কোনো খোঁজ নেই। কত জায়গায়, কত মানুষের কাছে, কত আত্মীয়স্বজনের কাছে গিয়েছেন বৃদ্ধ মা-বাবা, কেউই কিছু বলতে পারেন না। হাঁটতে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে সেই যে গেলেন হনুফা বেগম, আর ফিরলেন না।
গতকাল শনিবার বেলা ১১টার দিকে মুঠোফোনে নিখোঁজ মেয়ের কথা বলতে গিয়ে কান্না করছিলেন শান্তি বেগম (৭০)। তিনি চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার পেয়ারীখোলা গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর স্বামী লাল মিয়া পাটোয়ারী (৮০)। এই দম্পতির ছোট মেয়ে হনুফা বেগম ২০১৩ সালের নভেম্বরে বাড়ি থেকে হাঁটতে বেরিয়ে আর ফেরেননি।
শান্তি বেগম বলেন, মেয়ের জন্য কাঁদতে কাঁদতে তাঁর চোখ ঝাপসা হয়ে গেছে। দীর্ঘ এই অপেক্ষা তাঁকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছে, তবু মেয়ের ফিরে আসার আশা তিনি ছাড়তে পারেননি।
নিখোঁজ হওয়ার সময় হনুফার বয়স ছিল ১৬ বছর। চার বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট। স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন তিনি।
হনুফার চাচাতো বোন জুবাইদা সুলতানা মুঠোফোনে বলেন, ২০১৩ সালের নভেম্বরের এক বিকেলে বাড়ির পাশে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন হনুফা। তারপর আর ফেরেননি। তাঁর সঙ্গে মুঠোফোন ছিল না।
আত্মীয়স্বজনের কাছে খোঁজ করেও কোনো সন্ধান মেলেনি। জুবাইদা জানতেন, কোনো ছেলের সঙ্গে হনুফার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল না। নিখোঁজের ঘটনাটি সে সময় থানা-পুলিশকে জানানো হয়েছিল, মতলব দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছিল।
কয়েক বছর আগে স্ট্রোক করেন হনুফার বাবা। এখন প্রায় অচল হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন তিনি। শান্তি বেগম মেয়ের শোকে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, কারও সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলেন না।
কয়েক বছর আগে স্থানীয় এক জ্যোতিষী ও এক কবিরাজের কাছে গিয়েছিলেন শান্তি বেগম। তাঁরা বলেছেন, হনুফা আর বেঁচে নেই। এর পর থেকে মানসিক ও শারীরিকভাবে আরও ভেঙে পড়েছেন তিনি।
জুবাইদা বলেন, হনুফার সন্ধান চেয়ে একাধিকবার ফেসবুকে ও স্থানীয় গণমাধ্যমে জানানো হয়েছে। এখনো মেয়ের আশায় দিন কাটছে বৃদ্ধ মা-বাবার, তাঁদের আশা একদিন হনুফা বাড়ি ফিরে আসবেন।
হনুফার মা-বাবা মুঠোফোন ব্যবহার করেন না। মেয়ের কথা কারও সঙ্গে তেমন বলতেও চান না। গতকাল জুবাইদার মুঠোফোনে কিছুক্ষণ কথা বলতে রাজি হন শান্তি বেগম।
কান্না করতে করতে তিনি বলেন, গণক-কবিরাজও ধরেছেন, তাঁরা বলেছেন তাঁর মেয়ে নাকি নেই, মারা গেছে। এই কথা শুনে তিনি আরও অসুস্থ হয়ে গেছেন, খেতে ও ঘুমাতে পারছেন না, তাঁর সব শেষ। একটু থেমে তিনি বলেন, মেয়েটা বড় ভালো ছিল, সে বেঁচে আছে নাকি তাকে মেরে ফেলা হয়েছে, তাও তিনি জানেন না; তাঁর মেয়েকে তাঁর কোলে এনে দেওয়ার আকুতি জানান তিনি।
হনুফার পরিবারের করা জিডির বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন জানিয়ে মতলব দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান বলেন, তিনি মেয়েটির সন্ধানের জন্য চেষ্টা করবেন। ১৩ বছর আগের সেই নিখোঁজের রহস্য উদ্ঘাটনে এই আশ্বাসই এখন পরিবারটির সামনে নতুন করে অপেক্ষার কারণ।





