চিনি ছাড়া ব্ল্যাক কফি কি রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সত্যিই সাহায্য করে?
সকালের শুরুতে এক কাপ ব্ল্যাক কফি অনেকেরই নিয়মিত অভ্যাস। চিনি ও দুধ ছাড়া কফিতে ক্যালরির পরিমাণ কম থাকায় ওজন নিয়ন্ত্রণে আগ্রহীদের কাছেও এটি বেশ জনপ্রিয়। পাশাপাশি রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, কোলেস্টেরল ও লিভারের স্বাস্থ্য নিয়ে কফির সম্ভাব্য উপকারিতার কথাও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
তবে ব্ল্যাক কফি পান করলেই এসব সমস্যা নিয়ন্ত্রণে থাকবে, এমনটা ভাবার সুযোগ নেই। এটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে, কিন্তু কোনো রোগের চিকিৎসার বিকল্প নয়—এই সতর্কবার্তাই গবেষণার ফলাফল পড়ার সময় মনে রাখা জরুরি।
দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণমূলক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত কফি পান করেন এমন মানুষের মধ্যে টাইপ টু ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তুলনামূলক কম হতে পারে। তবে এ থেকে সরাসরি বলা যায় না যে কফি পান করলেই ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব।
খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা, ওজন ও জীবনযাপনের অন্যান্য বিষয়ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকিকে প্রভাবিত করে। ফলে কফিকে একক কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; পুরো জীবনযাপনের ছবির মধ্যেই এর জায়গা বুঝতে হবে।
এ ছাড়া কফিতে থাকা ক্যাফেইন স্বল্পমেয়াদে কিছু মানুষের ইনসুলিনের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে খাবারের পর রক্তে শর্করার মাত্রা সাময়িকভাবে বেড়ে যেতে পারে। তাই রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের তাৎক্ষণিক উপায় হিসেবে ব্ল্যাক কফির ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়।
কফির ধরন ও তৈরির পদ্ধতির ওপরও এর প্রভাব নির্ভর করতে পারে। অপরিশোধিত বা ফুটিয়ে তৈরি করা কফিতে ক্যাফেস্টল ও কাহওয়েল নামের দুটি প্রাকৃতিক যৌগ থাকে। নিয়মিত বেশি পরিমাণে এ ধরনের কফি পান করলে রক্তে মোট কোলেস্টেরল ও এলডিএল বা ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে, কাগজের ফিল্টারে তৈরি কফিতে এসব যৌগের বড় একটি অংশ আটকে যায়। ফলে এ ধরনের কফিতে ক্যাফেস্টল ও কাহওয়েলের পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকে। যাঁরা কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ে সচেতন, তাঁদের জন্য কফি তৈরির পদ্ধতি বিবেচনায় রাখা ভালো।
লিভারের স্বাস্থ্যের সঙ্গেও কফি পানের ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায়। নিয়মিত কফি পান করেন এমন মানুষের মধ্যে ফ্যাটি লিভার ও লিভারের সিরোসিসের ঝুঁকি তুলনামূলক কম দেখা গেছে।
তবে এসব গবেষণার ফলাফল থেকে কফিকে লিভারের রোগের চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। কফি পান করলেই লিভারের এনজাইম বা সিরোসিসের মাত্রা কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। লিভারের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই জরুরি।
কফি পান করতে পছন্দ করলে পরিমিত পরিমাণে চিনি ছাড়া ব্ল্যাক কফি দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ে যারা সচেতন, তাঁদের জন্য কাগজের ফিল্টারে তৈরি কফি তুলনামূলক ভালো বিকল্প।
তবে কফিতে অতিরিক্ত চিনি, সিরাপ বা মিষ্টি ক্রিম মেশালে ক্যালরির পরিমাণ বেড়ে যায়। যারা ওজন বা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেন, তাঁদের এ বিষয়ে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। অন্যদিকে, যারা সাধারণত কফি পান করেন না, শুধু রক্তে শর্করা বা কোলেস্টেরলের মাত্রা কমানোর আশায় তাঁদের কফি পান শুরু করার প্রয়োজন নেই। ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীলতা, ঘুমের সমস্যা কিংবা অন্য কোনো শারীরিক অসুবিধা থাকলে কফি পানের পরিমাণের বিষয়ে সতর্ক থাকা ভালো।
এক কাপ ব্ল্যাক কফি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ হতে পারে। তবে বিপাকীয় স্বাস্থ্য ভালো রাখতে কফির চেয়ে সামগ্রিক জীবনযাপনের ভূমিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সুষম খাবার খাওয়া, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত শরীরচর্চা ও পর্যাপ্ত ঘুম জরুরি। অ্যালকোহল গ্রহণের অভ্যাস থাকলে তা সীমিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই সকালে এক কাপ চিনি ছাড়া ব্ল্যাক কফি উপভোগ করা যেতে পারে, তবে শুধু কফির ওপর নির্ভর না করে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত জীবনযাপনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকার চেষ্টা করাই ভালো।




