তিরানায় আবার ভয়াবহ সংঘর্ষ: আহত তিন শতাধিক, সরকারি ভবনে হামলা, পদত্যাগের দাবিতে অনড় বিক্ষোভকারীরা
আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ আবারও ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। শনিবার পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে বিক্ষোভকারী ও পুলিশ মিলিয়ে তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোর মধ্যে এটাই ছিল সবচেয়ে তীব্র সংঘর্ষ। পুলিশ জনতা ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস, জলকামান ও রাবার বুলেট ব্যবহার করেছে।
বিক্ষোভকারীরা কয়েকটি সরকারি ভবনে হামলা চালিয়েছে এবং ডজনখানেক বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ সংগঠকদের ডাকে সাড়া দিয়ে তিরানার সমাবেশে যোগ দেন। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সারা আলবেনিয়া থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই কর্মসূচিতে অংশ নেন; বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, শিল্পী ও বিরোধী দলগুলোও এই সমাবেশের প্রতি সমর্থন বা অংশগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছিল।
আলবেনিয়ায় অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে স্কুলের বাজে অবস্থা ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রতিবাদে ধারাবাহিক বিক্ষোভ চলছে এবং পুলিশের সঙ্গে নিয়মিত সংঘর্ষ হচ্ছে। মাঝে কয়েক দিন পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত থাকলেও শনিবারের কর্মসূচি আবার উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়। বিক্ষোভের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়; শনিবার ভিড়ের একাংশ ভবনটি লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ে এবং জ্বলন্ত বর্জ্যের ড্রাম গড়িয়ে দেয়।
শনিবার রাজধানীজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, শহরে ঢোকার পথে গাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়। তারপরও হাজারো মানুষের জমায়েত ঠেকানো যায়নি এবং দিনের একপর্যায়ে সংঘর্ষ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। আহতের সংখ্যা তিন শতাধিক হওয়ায় দিনটিকে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সবচেয়ে রক্তাক্ত দিনগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই অসন্তোষের শিকড় আরও পুরনো। গত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত একটি বিলাসবহুল হোটেল প্রকল্পের খবর প্রকাশের পর থেকেই আলবেনিয়ায় মাঝে মাঝে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সেই ক্ষোভ আরও প্রশস্ত হয়ে দুর্নীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিরুদ্ধে আন্দোলনে রূপ নিয়েছে এবং বিক্ষোভকারীরা সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী এডি রামার পদত্যাগ দাবি করছেন।
প্রধানমন্ত্রী এডি রামা সহিংসতার জন্য বিদেশি শক্তিকে দায়ী করেছেন। তাঁর অভিযোগ, রাশিয়া ও ইরান অনলাইনে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে এই উত্তেজনা উসকে দিচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি সংলাপের আহ্বানও জানিয়েছেন। শনিবার আলোচনা ও সংলাপের প্রতীকী ইঙ্গিত হিসেবে সরকারি সদর দপ্তরের বাইরে লাল গদি বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু বিক্ষোভকারীরা পরে সেসব গদিতে আগুন ধরিয়ে দেন। ফলে সংলাপের সেই প্রতীকী উদ্যোগ কার্যত ব্যর্থ হয়ে যায়।
বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভ শুধু সরকারের দিকেই নয়। তাঁরা পুরো রাজনৈতিক শ্রেণিকেই এই সংকটের জন্য দায়ী করছেন। সমাবেশে কাউকে কাউকে প্রধানমন্ত্রী রামার বিরোধী কেন্দ্র-ডানপন্থি নেতা সালি বেরিশার সমালোচনা করা প্ল্যাকার্ড বহন করতেও দেখা গেছে। অর্থাৎ সরকার বদলই নয়, বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিই একাংশের অনাস্থা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ছোট এই বলকান দেশটিতে স্কুলের অবস্থা, দ্রব্যমূল্য ও দুর্নীতির প্রশ্ন এখন একই সুতোয় গাঁথা হয়ে গেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ জমায়েত হলেও দাবিগুলো অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থার গভীরে পৌঁছেছে। বিরোধী দল, অধ্যাপক ও শিল্পীদের সমর্থন আন্দোলনটিকে আরও প্রশস্ত করেছে, ফলে এটি আর শুধু শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ নেই।
সরকারের পক্ষ থেকে সংলাপের আহ্বান এলেও মাঠের চিত্র ভিন্ন। লাল গদিতে আগুন, সরকারি ভবনে হামলা এবং পুলিশের কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান — সব মিলিয়ে দুই পক্ষের দূরত্ব আরও বেড়েছে বলেই মনে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর বিদেশি হাতের অভিযোগ বিক্ষোভকারীদের দাবিকে সরাসরি মোকাবিলা না করে বিতর্ককে আরও রাজনৈতিক করে তুলেছে।
শনিবারের ঘটনার পর এখন সবার চোখ তিরানার পরের কর্মসূচির দিকে। বিক্ষোভকারীরা পদত্যাগের দাবিতে অনড় থাকলে এবং সরকার সংলাপের বদলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর করলে সংঘর্ষের এই ধারা আরও দীর্ঘ হতে পারে। আহতের বড় সংখ্যা এবং গ্রেপ্তারের ঘটনা আগামী দিনগুলোতে উত্তেজনা কমাবে নাকি বাড়াবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।





