মাদ্রাসায় একের পর এক যৌন নিপীড়নের অভিযোগে উদ্বেগ ধর্মমন্ত্রীর, কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা; তদারকি নিয়ে বড় প্রশ্ন
দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় একের পর এক শিশু শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ, শিক্ষক গ্রেপ্তার এবং কোনো কোনো ঘটনায় শিশুর মৃত্যুর খবর সামনে আসায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ। শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির ত্রিবার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে উচ্চ আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে — অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের জন্য কমিটি গঠন, প্রতিকার এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দেশে আলিয়া ধারার মাদ্রাসার জন্য রয়েছে শিক্ষা বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরের তদারকির কাঠামো; অন্যদিকে কওমি মাদ্রাসাগুলো পরিচালিত হয় নিজস্ব শিক্ষা বোর্ড ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। কিন্তু দুই ধারাতেই নির্যাতনের অভিযোগ সামনে এলেও প্রতিরোধ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর এবং দায়বদ্ধতা কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সম্প্রতি গাজীপুরের টঙ্গী ও গাছায় দুটি কওমি মাদ্রাসায় শিশু শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে আট বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীকে একাধিকবার বলাৎকারের অভিযোগে প্রধান শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে কওমি মাদ্রাসার এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। আলিয়া ধারার দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষকের বিরুদ্ধেও ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে।
গত ২০ অক্টোবর গাজীপুরের টঙ্গীর মধ্য আউচপাড়ায় ‘ক্বারীউল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসা’র উপাধ্যক্ষ মোসলেউদ্দিনের বিরুদ্ধে সাত বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে। শিশুটির পরিবারের অভিযোগ, শিক্ষক তাকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে চুমু দেন এবং বিষয়টি কাউকে জানালে মারধরের ভয় দেখান। শিশুটির বাবার করা মামলায় অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়; আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর ইউনিয়নের পাকুড়িয়া গ্রামের কওমি ধারার দারুল আবরার মাদ্রাসার শিক্ষক সাঈদ হোসেন ওরফে নান্নুর বিরুদ্ধে নয় বছর বয়সী তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ওঠে। শিশুটির মা ২০ অক্টোবর মামলা করেন; পুলিশ শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়।
গাজীপুরের গাছা থানার কলমেশ্বর এলাকার দারুল হেদায়া কওমি মাদ্রাসায় আট বছর বয়সী এক আবাসিক শিক্ষার্থীকে একাধিকবার যৌন নিপীড়নের অভিযোগে শিক্ষক অলিউল্লাহ ইসলাম ও মাদ্রাসার পরিচালক মোহাম্মদ মিজানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ; গত ২৩ অক্টোবর তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। মামলার এজাহার অনুযায়ী, শিশুটির পরিবার অভিযোগ জানানোর পরও অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি; ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে। মামলায় তিনজনকে আসামি করা হয়েছে, তাদের মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে আট বছর বয়সী এক মাদ্রাসাছাত্রকে একাধিকবার বলাৎকারের অভিযোগে প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ রমিজ উদ্দীনকে গত ৩ আগস্ট গ্রেপ্তার করে র্যাব। এজাহার অনুযায়ী, শিশুটি বাঁশখালীর বৈলছড়ি ইউনিয়নের পশ্চিম চেচুরিয়া ঘোনাপাড়ার দারুসসুন্নাহ খাইরিয়া মাদ্রাসার নাজেরা বিভাগের শিক্ষার্থী; ভর্তি হওয়ার পর থেকে শিক্ষক বিভিন্ন সময়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাকে নির্যাতন করতেন বলে অভিযোগ। শিশুটির বাবা ২৯ জুলাই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন।
আগের ঘটনাগুলোও নিরাপত্তা ও জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনেছে। ২০১৯ সালের জুনে যশোরের শার্শায় ১২ বছর বয়সী মাদ্রাসাছাত্র শাহ পরাণকে যৌন নির্যাতনের চেষ্টা ও হত্যার অভিযোগে শিক্ষক হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২২ সালের মার্চে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে কওমি মাদ্রাসার আট বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইফতেখার মালেকুল মাশফিকের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তিন শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়। পাবনার ভাঁড়ারায় নুরে মদিনা মহিলা কওমি মাদ্রাসার ছাত্রীর ওপর নির্যাতন ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে শিক্ষক ও পরিচালক মো. আবু ইউসুফকে গত ২২ অক্টোবর স্থানীয় লোকজন আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন; পরদিন বিক্ষুব্ধ লোকজন মাদ্রাসাটিতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। আলিয়া ধারায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় দাখিল মাদ্রাসার গণিতশিক্ষক আবুল বাশারের বিরুদ্ধে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে — চিকিৎসা পরীক্ষায় ছাত্রীটি তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা বলে জানা যায়; পরে শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরিসংখ্যানও উদ্বেগের চিত্র দিচ্ছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত দেশে ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার এবং ৪৬ শিশু ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে। ফ্রান্সভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্সের (জেএমবিএফ) পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছেলেশিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ১৩১টি ঘটনায় ১৭১ জন ভুক্তভোগীর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে; এর মধ্যে ৭২টি ঘটনা মাদ্রাসায় ঘটেছে, যেখানে ১০৯ জন ছেলেশিশু ভুক্তভোগী হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে এবং ৬৫টি ঘটনায় ৮১ জন মাদ্রাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। আসকের আরেক হিসাবে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে নারী ও শিশু ধর্ষণের ৬৪১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে — নারী ৪০০টি, শিশু ২৪১টি। তবে কোনো সংস্থাই প্রতিষ্ঠানভিত্তিক আলাদা পরিসংখ্যান রাখে না, ফলে মাদ্রাসায় ঘটনার মাস বা বছরভিত্তিক নির্দিষ্ট হিসাব নেই।
২০০৯ সালের ১৪ মে হাইকোর্ট বিভাগ কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নির্দেশনামূলক রায় দেন — সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিযোগ কমিটি গঠনসহ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে, কমিটির প্রধান নারী হওয়া এবং প্রতিষ্ঠানের বাইরের অন্তত দুজন সদস্য রাখার বিধানও রয়েছে। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল অধিভুক্ত মাদ্রাসায় যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেয়; এর আগে ১৬ এপ্রিল মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদফতর কমিটি গঠন ও তদারকি জোরদারে নোটিশ দেয়। সম্প্রতিক ঘটনাগুলো সামনে আসায় মাদ্রাসাগুলোতে এসব নির্দেশনা কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আইনজীবী ও মানবাধিকার সংগঠকদের মতে, অভিযোগ আমলে না নিলে প্রতিষ্ঠানপ্রধানেরও জবাবদিহি জরুরি। রাইজ ফর রাইটস ফাউন্ডেশনের যুগ্ম সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জাহিদ হাসান ফাহাদ বলেন, টঙ্গীর ঘটনায় অভিযোগ জানানোর পরও কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে ধরে নেওয়া যেতে পারে, প্রতিষ্ঠানটিতে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিরোধ কমিটিও কার্যকর নেই। তাঁর ভাষায়, অভিযোগ আমলে না নেওয়া বা নির্দেশনা না মানার প্রমাণ মিললে শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তি নন, প্রতিষ্ঠান ও তার প্রধানকেও আইনের আওতায় আনা জরুরি; দীর্ঘ সময় পরও অনেক প্রতিষ্ঠানে কমিটি গঠন হয়নি বা কার্যকর নয়, এবং নির্দেশনা বাস্তবায়নে তদারকির ঘাটতি থাকলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। আসকের সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, তাঁরা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক আলাদা হিসাব রাখেন না, তবে তাঁদের পর্যবেক্ষণ বলছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ঘটনা মাদ্রাসাতেও আছে এবং সেখানে ছেলে শিক্ষার্থীদের বলাৎকারের মতো ঘটনাও দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মুহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন খান বলেন, ‘মাদ্রাসাগুলোতে যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে আমরা নিয়মিত নির্দেশনা দিই। সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা প্রচার করা এবং নির্ধারিত সময়ে অভিভাবকদের সঙ্গে সভা করে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে বলা হয়। মাঠপর্যায়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম তদারকি করা হয়। তবে অধিদফতরের নিজস্ব মাঠপর্যায়ের সরাসরি তদারকির ব্যবস্থা নেই।’ তিনি স্বীকার করেন, সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা অনেক ঘটছে এবং মনিটরিং আরও জোরদার করা প্রয়োজন। কওমি ধারার ক্ষেত্রে ছয়টি শিক্ষা বোর্ডকে নিয়ে গঠিত আল-হাইআতুল উলয়া দাওরায়ে হাদিস সনদের স্বীকৃতি ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সমন্বয় করে, তবে প্রতিটি মাদ্রাসার দৈনন্দিন তদারকি বা অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব তার নয় — ফলে কওমি মাদ্রাসায় শিশু সুরক্ষা, অভিযোগ তদন্ত ও বোর্ডের তদারকির ব্যবস্থা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
একই অনুষ্ঠানে ধর্মমন্ত্রী আরও বলেন, এ দেশের ইমাম-আলেম ও কওমি ওলামায়ে কেরাম যাঁরা ইসলামের ধারক-বাহক, তাঁদের জন্য গায়ের রক্ত দিতে হলেও তিনি দ্বিধা করবেন না। ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করতে কেউ যাতে উসকানি দিতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি; জুমার খুতবায় মাদক, সন্ত্রাস ও অন্যান্য সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য দিতে ইমামদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। অনুষ্ঠানে ইমাম সমিতির নেতারা ইমামদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সমস্যা ও দাবি তুলে ধরেন। মন্ত্রীর কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণার পর এখন দেখার বিষয়, মাদ্রাসাগুলোতে প্রতিরোধ কমিটি গঠন, অভিযোগ তদন্ত ও তদারকির ঘাটতি কাটাতে বাস্তবে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।






