জাহাঙ্গীর হত্যা: ছোট ভাই আলমগীরই পরিকল্পনাকারী, সংবাদ সম্মেলনে দাবি স্ত্রী তাসলিমার, পিবিআই তদন্তের আবেদন
কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর হত্যাকাণ্ড নিয়ে নতুন করে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী এবং অর্থের জোগানদাতা তাঁরই ছোট ভাই আলমগীর শিকদার — শনিবার বিকেলে এমন অভিযোগ করেছেন নিহতের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার। মিঠামইনের বেড়িবাঁধ এলাকায় নিহত জাহাঙ্গীরের বাসভবনে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি এই অভিযোগ তোলেন।
তাসলিমার দাবি, এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম আসামি হেলাল কারাগার থেকে ফোন করে তাঁকে এসব তথ্য জানিয়েছেন। সেই ফোনালাপের ভিত্তিতেই তিনি ছোট ভাইয়ের দিকে আঙুল তুলেছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান। তবে এই ফোনালাপের সত্যতা নিয়েই পুলিশের পক্ষ থেকে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে, ফলে অভিযোগটি এখন তদন্ত ও যাচাইয়ের বিষয়।
সংবাদ সম্মেলনে তাসলিমা আক্তার মিঠামইন থানার ওসি মনোয়ারের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ তোলেন। তাঁর অভিযোগ, আসামি হেলালকে রিমান্ডে নেওয়ার পর আলমগীরের নাম বলায় তাঁকে মারধর ও শরীরে ইনজেকশন পুশ করেন ওসি মনোয়ার। যে কারণে হেলাল বাধ্য হয়ে ১৬৪ ধারায় আলমগীরের নাম বলেননি। ওসি মনোয়ারের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবিও জানান তিনি।
তাসলিমা প্রশ্ন তোলেন, বহিষ্কৃত ছাত্রদল নেতা খোকাকে গ্রেপ্তার করে থানায় আনার পর বাদীকে দেখার সুযোগ না দিয়ে আলমগীর শিকদারের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেওয়া হলো কেন? তাঁর আরও দাবি, মামলার শুরুতে আলমগীর শিকদারের পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। পরবর্তীতে তাঁকে দেশ থেকে পালাতে পাসপোর্ট দিয়ে সাহায্য করা হলো কেন — এই প্রশ্নের জবাবও চেয়েছেন তিনি।
নিহতের স্ত্রীর দাবি, হত্যা মামলাটি মিঠামইন থানা থেকে ডিবিতে হস্তান্তর করার পর থেকেই আলমগীর শিকদার পলাতক। প্রশাসন যেন অতি দ্রুত তাঁর পাসপোর্ট জব্দ করে, সেই দাবি জানিয়েছেন তিনি। তাঁকে দেশত্যাগে কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ সহায়তা করে থাকলে সেটিও তদন্তের আওতায় আনতে হবে বলে তিনি বলেন।
তাসলিমা বলেন, মৃত্যুর কিছুদিন আগে তাঁর স্বামী জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর থানায় একটি অভিযোগ দাখিল করেছিলেন আলমগীর শিকদারের বিরুদ্ধে। অভিযোগে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, আলমগীর তাঁকে খুন করতে পারেন — এবং তাঁর দাবি, সেই আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে। ওই অভিযোগের তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন এসআই সাব্বির। হত্যাকাণ্ডের পরদিন সাব্বিরকে কেন তাড়াহুড়ো করে বদলি করা হয়, সেই জবাবও চেয়েছেন তিনি।
নিহতের স্ত্রীর অভিযোগে আরেকজনের নামও এসেছে — বাচ্চু। তাঁর অভিযোগ, এই হত্যাকাণ্ডে বাচ্চু প্রধান অভিযুক্ত। খুনি ভাড়া করা, খুনিদের লালন-পালন করা এবং তাঁদের থাকার জন্য বাসা ভাড়া নেওয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাচ্চুর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এত গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বাচ্চুকে এখনো কেন গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তাসলিমা আক্তার আরও বলেন, ‘নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে তদন্ত সম্পন্ন করার জন্য আমি মামলাটি পিবিআইয়ে হস্তান্তরের আবেদন করেছি। আমি দ্রুত এই মামলার তদন্তভার পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তরের জোর দাবি জানাচ্ছি, যাতে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হয় এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তি আইনের আওতায় আসে।’ মামলাটি বর্তমানে ডিবি তদন্ত করছে।
সংবাদ সম্মেলনে নিহত জাহাঙ্গীরের বড় বোন নাদিরা পারভীনও অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যেন এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে বাড়াবাড়ি না করি, সে জন্য আলমগীর আমাদের ভাইবোনকে ফোনে হুমকি দিচ্ছেন।’ পরিবারের পক্ষ থেকে এই হুমকির অভিযোগও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নিহত জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই আলমগীর। তিনি বলেন, ‘এসব অভিযোগ ষড়যন্ত্রমূলক ও ভিত্তিহীন।’ ফলে একই পরিবারের দুই পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত বক্তব্য আসছে, যার সত্যতা নির্ধারণের দায় এখন তদন্তের ওপর।
ফোনালাপে প্রকৃতপক্ষে আসামি হেলাল ও বাদী তাসলিমা ছিলেন কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন মিঠামইন থানার ওসি মনোয়ার হোসেন। তিনি এই ফোনালাপকে এআই-নির্মিত বলে সন্দেহ করছেন। মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মামলাটি বর্তমানে ডিবি তদন্ত করছে।
এ বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, ফোনালাপের বিষয়টি তাঁদের কাছেও সন্দেহ হচ্ছে। তবে বাদীপক্ষের উচিত হয়নি এটি জনসম্মুখে প্রকাশ করা। এটি পুলিশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তিনি বলেন, ‘আমরা এটা তদন্ত করে দেখব। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে এ নিয়ে আমরা লিখিত দেব। ঘটনায় জড়িত কেউ ছাড় পাবে না।’
ফলে জাহাঙ্গীর হত্যা মামলায় এখন একাধিক প্রশ্ন একসঙ্গে সামনে এসেছে — ফোনালাপ আসল নাকি এআই-নির্মিত, আলমগীরের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি কতটা শক্ত, বাচ্চুকে কেন গ্রেপ্তার করা হয়নি এবং মামলাটি পিবিআইয়ে যাবে কি না। সংবাদ সম্মেলনের পর এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে।






