পাঁচ বছর চিকিৎসার পর জানা গেল এমএস নয়: ক্রিস্টিনা অ্যাপলগেটের ভুল রোগনির্ণয় ঘিরে প্রশ্ন
হলিউড অভিনেত্রী ক্রিস্টিনা অ্যাপলগেটের সাম্প্রতিক প্রকাশ — তিনি মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসে (এমএস) আক্রান্ত ছিলেন না, তার রোগনির্ণয় ছিল ভুল — প্রশ্ন তুলেছে, বছরের পর বছর চিকিৎসা চলার পরও কীভাবে একটি রোগ অন্য রোগ বলে শনাক্ত হতে পারে।
৫৪ বছর বয়সি এই অভিনেত্রী ২০ অক্টোবরের ‘মেসি’ পডকাস্ট পর্বে সহ-উপস্থাপক জেমি-লিন সিগলারের সঙ্গে এই খবর জানান। তিনি বলেন, তিনি পুরোপুরি ‘হতবাক অবস্থায়’ ছিলেন।
অ্যাপলগেট প্রথম এমএস রোগে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হন ২০২১ সালে। তখন তিনি দুর্বল করে দেওয়ার মতো উপসর্গে ভুগছিলেন এবং মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের এমআরআই ও স্পাইনাল ট্যাপসহ ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। তিনি জানান, চিকিৎসকেরা তার মস্তিষ্কে ডজনখানেক লিশন (ক্ষতচিহ্ন) খুঁজে পেয়েছিলেন।
বছরের পর বছর চিকিৎসার পর তার চিকিৎসক নিয়মিত ইনফিউশন বন্ধ করে বি-সেল পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নেন। অ্যাপলগেট বলেন, ‘আমার বি-সেল বদলায়নি। সেগুলো বাড়েওনি, কমেওনি, কোনো পরিবর্তনই হয়নি — আর তিনি (চিকিৎসক) এমনটা আগে কখনো দেখেননি। আমার মনে হয়, সেখান থেকেই আমার রোগনির্ণয় নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়।’
আরও মস্তিষ্কের স্ক্যানের পর চিকিৎসক তার ঘরে এসে বলেন, ‘অভিনন্দন, আপনার এমএস নেই।’ তবে অভিনেত্রী এটিকে সুখবর হিসেবে নিতে পারেননি।
তিনি বলেন, ‘কারণ ভুল রোগনির্ণয়ের পর হঠাৎ করে কেউ ভালো হয়ে যায় না। আমি ভালো হইনি… বরং কোনো কোনো দিক থেকে আরও খারাপ হয়েছি।’ তিনি জানান, তার মধ্যে এমএস রোগীর ‘প্রতিটি উপসর্গ’ রয়েছে, আর অনেক রোগের উপসর্গই এমএসের মতো হতে পারে।
তিনি স্মরণ করেন, তার এমআরআইতে স্পষ্টভাবে প্রায় ৩০টি লিশন দেখা গিয়েছিল, কিন্তু তার নিউরোলজিস্ট একটি ভিন্ন বৈশিষ্ট্য — যাকে তিনি ‘সুতো’ বলে বর্ণনা করেছেন — চিহ্নিত করেন, যা থেকে সিদ্ধান্ত হয় তার এমএস নেই। তার ভাষায়, ‘তাই আমি আবার শুরুর অবস্থানে ফিরে গেছি, বুঝতে পারছি না আমার কী হচ্ছে।’
লস অ্যাঞ্জেলেসের সিডারস-সাইনাইয়ের নিউরোলজির সহযোগী অধ্যাপক ডা. মারওয়া কাইসি ‘মেসি’ পডকাস্টের পরবর্তী একটি পর্বে বলেন, এমএস ভুল শনাক্ত হওয়া ‘বেশ সাধারণ’ ঘটনা। অ্যাপলগেটের চিকিৎসা না করা এই চিকিৎসক জানান, ইউসিএলএ ও সিডারস-সাইনাইয়ের এমএস ক্লিনিকে পাঠানো রোগীদের ওপর তার গবেষণায় দেখা গেছে, এমএস রোগনির্ণয় নিয়ে আসা প্রতি পাঁচজনের মধ্যে প্রায় একজন শেষ পর্যন্ত এমএসে আক্রান্ত ছিলেন না।
কাইসি বলেন, ‘কেউ কেউ কয়েক দশক ধরে (ভুলভাবে) শনাক্ত হয়ে ছিলেন। আর তাদের বেশির ভাগই এমএসের ওষুধ খাচ্ছিলেন।’ তার মতে, মূল চ্যালেঞ্জ হলো এমএসের জন্য কোনো একক পরীক্ষা নেই — ‘এটা গর্ভাবস্থা পরীক্ষার মতো নয় যে হ্যাঁ, আছে কিংবা না, নেই বলে দেবে।’ বরং এটি মানদণ্ডের একটি তালিকা, যার কিছু অংশ কিছুটা ব্যক্তিনির্ভর থেকে যায়।
চিকিৎসকেরা জানান, ভুল শনাক্ত হওয়া বেশির ভাগ রোগীর এমআরআই স্ক্যানে সাদা পদার্থের দাগ বা লিশন ছিল, কিন্তু সেগুলোর কারণ এমএস ছিল না। নতুন ইমেজিং কৌশল চিকিৎসকদের সাহায্য করতে পারে — এর মধ্যে আছে ‘সেন্ট্রাল ভেইন সাইন’, যেখানে লিশনের কেন্দ্র দিয়ে যাওয়া ক্ষুদ্র রক্তনালি খোঁজা হয়, যা এমএসের বৈশিষ্ট্য। এই চিহ্নটি হালনাগাদ এমএস রোগনির্ণয় মানদণ্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বোস্টনের নিউরোলজিস্ট ও আমেরিকান ব্রেইন ফাউন্ডেশনের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ডা. রিচার্ড রানসোহফ সেন্ট্রাল ভেইন সাইনকে ‘সত্যিকারের অগ্রগতি’ বলে অভিহিত করেন। তিনিও অ্যাপলগেটের চিকিৎসা করেননি। তিনি বলেন, এমএস নির্ণয়ে নিশ্চিতভাবে বলার মতো কোনো একক উপাদান নেই, এবং রোগনির্ণয়ের পরও চিকিৎসকদের মন খোলা রাখতে হবে — চিকিৎসায় সাড়া না মিললে বা উপসর্গ মিল না খেলে পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
দুই নিউরোলজিস্টের মতে, পায়ে ঝিনঝিন বা অসাড়তা, ক্লান্তি ও মস্তিষ্কের ঝাপসা ভাবের মতো এমএসের অনেক উপসর্গ অন্য রোগেও খুব সাধারণ। এমএসের অনুকরণ করতে পারে এমন রোগের মধ্যে রয়েছে অল্প বয়সে স্ট্রোক, নিউরোমায়েলাইটিস অপটিকা স্পেকট্রাম ডিজিজ, এমওজি অ্যান্টিবডি রোগ, লুপাস ও মাইগ্রেন — মাইগ্রেনই সবচেয়ে সাধারণ বিকল্প রোগনির্ণয়গুলোর একটি।
কাইসি বলেন, এমএস রোগনির্ণয় ‘ফিরিয়ে নেওয়া’ প্রাথমিক রোগনির্ণয়ের চেয়েও কঠিন হতে পারে, বিশেষ করে যখন রোগটি কারও পরিচয়, পরিবার ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। তিনি রোগীদের প্রশ্ন করতে ও দ্বিতীয় মতামত নিতে ভয় না পাওয়ার পরামর্শ দেন। রানসোহফের পরামর্শ, এমএস শনাক্ত হওয়া প্রত্যেকেরই বিশেষায়িত এমএস কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া উচিত — যেখানে আজ ২০টির বেশি ওষুধসহ চিকিৎসার অভিজ্ঞতা রয়েছে। অ্যাপলগেটের ক্ষেত্রে অবশ্য বিকল্প কোনো সুনির্দিষ্ট রোগনির্ণয়ও এখনো পাওয়া যায়নি, ফলে তার অনুসন্ধান আবার নতুন করে শুরু হয়েছে।





