১৫ বছর লড়ে তৃতীয় জয়: নরফোকের বিরল জলাভূমি বাঁচালেন এক কৃষক দম্পতি
ইংল্যান্ডের নরফোকে একটি বিরল জলাভূমি বাঁচাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে ১৫ বছর ধরে আইনি লড়াই করে তৃতীয়বারের মতো বড় জয় পেয়েছেন এক কৃষক দম্পতি। এই মাসে হাইকোর্টে তাঁদের পক্ষে রায় এসেছে, যা পরিবেশ সুরক্ষায় একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
টিম ও গেলি হ্যারিস নরফোক ব্রডসে ৪৬০ একর জমিতে চাষাবাদ করেন। তাঁদের খামারের সঙ্গেই রয়েছে ক্যাটফিল্ড ফেন নামের জলাভূমিটি, যা পশ্চিম ইউরোপের সেরা চুনাপাথুরে জলাভূমিগুলোর একটি এবং আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি আবাস।
বিচারপতি লেডি জাস্টিস লিভেন রায়ে বলেছেন, প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার সরকারি সংস্থা ন্যাচারাল ইংল্যান্ড জলাভূমিটিকে দূষণ থেকে রক্ষায় তাদের আইনি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। আশপাশের আবাদি জমি থেকে নাইট্রেট ও ফসফেট ধুয়ে এসে এই জলাভূমির পানি দূষিত হচ্ছে।
এই জলাভূমি ২ হাজার ৫০০ প্রজাতির প্রাণের আবাস। এর মধ্যে রয়েছে ফেন অর্কিড, ক্রেস্টেড বাকলার ফার্নের মতো বিরল উদ্ভিদ আর প্রজননকারী বিটার্ন পাখি ও সোয়ালোটেইল প্রজাপতির মতো বিরল প্রাণী।
রায়ে বিচারক ২০২১ সালে হ্যারিস দম্পতি প্রথম দূষণের কথা জানানোর পর থেকে ন্যাচারাল ইংল্যান্ডের নিষ্ক্রিয়তার কড়া সমালোচনা করেছেন। তাঁর মন্তব্য, দূষণের কারণ ছিল একেবারে সাধারণ বুদ্ধির বিষয়, আর সরকারের সংরক্ষণ সংস্থার পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
দম্পতিটি ১৫ বছর ধরে নিজেদের পকেট থেকে ১৫ লাখ পাউন্ড খরচ করে সরকারি সংস্থাগুলোকে জবাবদিহির মুখে দাঁড় করিয়েছেন। জলাভূমিটি আইন দ্বারা সুরক্ষিত একটি বিশেষ সংরক্ষণ এলাকার (এসএসি) অংশ এবং এটি ব্রডস জাতীয় উদ্যানের ভেতরে অবস্থিত।
টিমের ভাষায়, বিষয়টি নরফোকের একটি ছোট খালের চেয়ে অনেক বড়। তাঁর আশঙ্কা, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর জড়তার কারণে সারা দেশের জলপথে দূষণ থামানো যাচ্ছে না। এই রায়কে তিনি মাইলফলক বলছেন, কারণ এতে বলা হয়েছে — সংস্থাগুলো কেবল হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারে না।
১৯৯৪ সালে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে চেয়ে দম্পতিটি খামারটি কিনেছিলেন; খামারের সঙ্গেই ছিল ক্যাটফিল্ড ফেনের বড় একটি অংশ। নিজেদের আবাদি জমি তাঁরা চারণভূমিতে পরিণত করেন, যাতে মাটি ও দূষণ ধুয়ে জলাভূমিতে না যায়। খামারে তাঁরা ইংলিশ হোয়াইট পার্ক গরু, ভেড়া আর বিরল জাতের এরিসকে টাট্টু ঘোড়া পালন করেন।
গেলির কাছে জলাভূমিটি এক টুকরো বন্যতা আর রহস্য। তিনি বলেন, এখানে এমন জায়গাও আছে যেখানে তাঁরা কখনো যাননি — একেবারে খাঁটি প্রকৃতি। টিম বলেন, এই জলাভূমি তৈরি হতে সময় লেগেছে এক হাজার বছর, অথচ মানুষ তা খুব দ্রুত ধ্বংস করে ফেলতে পারে। গেলির কথা, গাছে ভুল পানি দিলে যেমন গাছ দ্রুত মরে যায়, এখানেও তেমনটাই ঘটতে পারে।
এটি দম্পতিটির তৃতীয় আইনি জয়। ২০১৬ সালে তাঁরা একটি গণ-তদন্তে জিতেছিলেন, যাতে প্রমাণিত হয় পানি কোম্পানি ও স্থানীয় কৃষকদের অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি তোলায় উপত্যকাটি শুকিয়ে যাচ্ছিল। ২০২২ সালে দ্বিতীয় জয়ে তাঁরা পরিবেশ সংস্থাকে নরফোক ব্রডসের অন্য প্রকৃতিসমৃদ্ধ স্থানগুলোর কাছ থেকে পানি তোলা সীমিত করতে বাধ্য করেন।
ন্যাচারাল ইংল্যান্ড বলেছে, জলাভূমি রক্ষায় যথেষ্ট পদক্ষেপ না নেওয়ার আদালতের রায় তারা মেনে নিচ্ছে, তবে চলমান আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে মন্তব্য করবে না।
তাঁদের এই নীতির কারণে স্থানীয় কিছু বন্ধুত্বও নষ্ট হয়েছে। দম্পতিটি জানান, জাতীয় কৃষক ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা তাঁদের স্থানীয় শাখার সদস্যপদের আবেদন ফিরিয়ে দিয়েছেন — কারণ আলুর মতো লাভজনক ফসলের জন্য পানি তোলায় বিধিনিষেধে অনেক কৃষক ক্ষুব্ধ। টিমের কথা, তাঁরা নিজেরাও কৃষক, কৃষকবিরোধী নন।
২০২২ সালের জয়ের পর থেকে ক্যাটফিল্ড ফেনের খালগুলোতে পানির স্তর ও জীববৈচিত্র্যের উন্নতি লক্ষ করেছেন তাঁরা। গেলি বলেন, পরিস্থিতি ভালো না হওয়া পর্যন্ত যেন তাঁরাই এই জলাভূমির জন্য একটি ‘নূহের জাহাজ’। তবে প্রকৃতি জিতছে কি না, সে বিষয়ে তাঁরা আত্মতুষ্ট নন; এই গ্রীষ্মে জরিপকারীদের হিসাবে পোকামাকড়ের সংখ্যা কমতির দিকে বলেও জানান টিম।
ক্যাটফিল্ড ফেনের দূষণ থামাতে ন্যাচারাল ইংল্যান্ডকে ঠিক কী কী করতে হবে, সে বিষয়ে বিচারক আরও রায় দেবেন। হ্যারিস দম্পতির কাছে সমাধান সহজ — আবাদি জমি আর ব্রডসের দিকে যাওয়া খালের মাঝে ঘাসের বাফার স্ট্রিপ রাখার জন্য কৃষকদের অর্থ দিতে হবে, যাতে নাইট্রেটমিশ্রিত মাটি ধুয়ে না যায়। আরও বড় পরিসরে টিমের যুক্তি, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে নজরদারি ও বিধি প্রয়োগে সম্পদ ব্যবহার করতেই হবে।
৭৯ বছর বয়সী টিম বলছেন, তিনি এসব লড়াই চান না; বই পড়েই সময় কাটাতে চান। তাঁর মতে, দূষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেওয়া উচিত ব্রডস কর্তৃপক্ষেরই। তবু ব্রডসকে দূষণমুক্ত রাখতে আরও একটি আইনি চ্যালেঞ্জের কথা ভাবছেন তাঁরা। লড়াইটা তাঁদের পরেও চলবে — মেয়ে খামারের দায়িত্ব নেবেন, তিনি আইনজীবী; নাতনিও আইনজীবী। দম্পতিটির পরামর্শও সোজা — ধৈর্য লাগবে প্রচুর, আর লাগবে আবেগ; কারণ মানুষ কিছু না করলেই মন্দ ঘটে।






