ইরাকে আর কোনো মার্কিন সৈন্য নেই: বাগদাদের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা, ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে সব অস্ত্র রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে
ইরাকের ভেতরে পরামর্শক কিংবা নিয়মিত — কোনো ধরনের মার্কিন সেনাসদস্য আর অবশিষ্ট নেই বলে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে বাগদাদ। দেশটির প্রধানমন্ত্রী আলি ফালিহ আল-জাইদি এই তথ্য জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ২০২৭ সালের ৩০ জুনের মধ্যে দেশের সব ধরনের অস্ত্র কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্তের কথাও জানানো হয়েছে।
ইরাকি নিউজ এজেন্সিকে (আইএনএ) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আল-জাইদি বলেন, ভূখণ্ড থেকে বিদেশি বাহিনীর বিদায় নিশ্চিত হওয়ার পর স্থানীয় সশস্ত্র দলগুলোর অস্ত্র ধরে রাখার আর কোনো যৌক্তিকতা নেই। এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যে তিনটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে এবং বাকি চারটি দলের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, কোনো গোষ্ঠীর ছায়াতলে রাষ্ট্র চলতে পারে না; বরং রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের ভেতরেই সবাইকে পরিচালিত হতে হবে। বিদেশি সেনা চলে যাওয়ার পর সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়াই এখন তার সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য, আর সেজন্যই বেঁধে দেওয়া হয়েছে ২০২৭ সালের ৩০ জুনের সময়সীমা।
সরাসরি সামরিক উপস্থিতি শেষ হলেও ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হচ্ছে না। অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা জোরদারের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন আল-জাইদি। তিনি জানান, মার্কিন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে ইরাকে পুনর্গঠনমূলক কার্যক্রম শুরু করেছে।
এই বিদায়ের পেছনের ধারাবাহিকতাও তুলে ধরেন তিনি। মূলত ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ধারাবাহিকতায় গত ৩০ সেপ্টেম্বর এরবিল বিমান ঘাঁটি ছেড়ে যায় বিদেশি সেনারা, যার মধ্য দিয়ে ইসলামিক স্টেট (আইএস) বিরোধী আন্তর্জাতিক সামরিক অভিযানের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।
মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক অস্থিতিশীলতা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে ইরাক কোনো প্রকার সামরিক সংঘাতে জড়াবে না। পাশাপাশি প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধের যেকোনো পদক্ষেপ অর্থনৈতিকভাবে আত্মঘাতী হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জ্বালানি নিয়েও বড় পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন আল-জাইদি। হরমুজ প্রণালির সংকটের কারণে তেলের বৈশ্বিক বাজারমূল্যের সুবিধা আদায়ে তুরস্কের জেহান বন্দরের মাধ্যমে পুনরায় জ্বালানি তেল রপ্তানি চালুর সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি। ২০৩২ সালের মধ্যে দৈনিক তেল উৎপাদন এক কোটি ব্যারেলে উন্নীত করার মেগা পরিকল্পনা রয়েছে ইরাকের।
আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে তুরস্কের সঙ্গে প্রস্তাবিত ‘ডেভেলপমেন্ট রোড’ প্রকল্পকে ইরাকের ‘তৃতীয় নদী’ হিসেবে আখ্যা দেন তিনি। অর্থাৎ সেনা প্রত্যাহারের পর ইরাক এখন অর্থনীতি, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সংযোগকেই সামনে রাখতে চাইছে।
তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির এক প্রতিবেদনে প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এলো, যখন অঞ্চলজুড়ে সামরিক উত্তেজনা নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশ চলছে; সেই প্রেক্ষাপটে বাগদাদের ‘সংঘাতে জড়াব না’ অবস্থানটিও তাৎপর্যপূর্ণ।
এখন দেখার বিষয়, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের সময়সীমা বাস্তবায়নে বাকি চারটি সশস্ত্র দলের সঙ্গে আলোচনা কতটা এগোয় এবং রাষ্ট্রের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার এই পরিকল্পনা মাঠপর্যায়ে কতটা সফল হয়। পাশাপাশি সেনা উপস্থিতিহীন নতুন পর্যায়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্বের রূপটিও ধীরে ধীরে স্পষ্ট হবে।






