শরণার্থীদের শহর লিউইস্টনে কিশোর বন্দুকসহিংসতার সংকট, আতঙ্কে বাসিন্দারা
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চলের শহর লিউইস্টন, মেইন—যে শহরটি একসময় শরণার্থী ও অভিবাসীদের আগমনে বদলে গিয়েছিল—এখন কিশোর বন্দুকসহিংসতার এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর শহরটিতে বন্দুক-সংক্রান্ত ৩৫টি ঘটনা ঘটেছে, যার ২২টিতেই জড়িত কিশোরেরা।
লিউইস্টনের কিশোর মোহামেদ মুহুমেদ স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, “আমি নিরাপদ বোধ করি না। আমি আমার জীবন নিয়ে ভয় পাই। আমি দেখেছি, ওখানে ফুটপাতের মাঝখানে একজনকে ঘুষি মারা হয়েছে। এটা পাগলামি।” তার এই বক্তব্যেই ফুটে উঠেছে শহরের সাধারণ তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া আতঙ্কের চিত্র।
লিউইস্টন মেইনের দ্বিতীয় সর্বাধিক জনবহুল শহর। এখানে সোমালি ও অন্যান্য আফ্রিকান দেশ থেকে আসা শরণার্থীদের একটি বড় জনগোষ্ঠী বসবাস করে। শহরের পুলিশপ্রধান কার্লি কনলি বন্দুকসহিংসতাকে শহরের সামনে থাকা “সবচেয়ে গুরুতর জননিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলোর একটি” বলে বর্ণনা করেছেন।
স্থানীয় সাংবাদিক জন ফেদারস্টন, যিনি এই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক প্রতিবেদন করেছেন, বলেছেন, লিউইস্টনের বন্দুকসহিংসতা খুবই উদ্বেগজনক এবং এর বেশিরভাগই ঘটিয়েছে কিশোরেরা। তার ভাষায়, বহুবার কিশোরদের গ্রেপ্তার করা হলেও আদালত তাদের সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিয়েছে এবং তারা আবার রাস্তায় ফিরে গেছে।
ফেদারস্টন আরও বলেন, আদালতব্যবস্থার ওপর চাপ পড়েছে, কিশোরদের কারাগারে না পাঠানোয় জেলা অ্যাটর্নি হতাশ, বাসিন্দারা ভীত ও ক্ষুব্ধ, আর “কিশোররা কিশোরদের গুলি করছে”—এটি শহরে প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় শহর কর্তৃপক্ষ টহল ও অভিযান বাড়াতে পুলিশের অতিরিক্ত সময়ের কাজের জন্য অতিরিক্ত ২ লাখ ডলার তহবিল অনুমোদন করেছে। পাশাপাশি মেইনের কিশোর বিচারব্যবস্থায় পরিবর্তনের আহ্বান জানানো হয়েছে—যার মধ্যে বারবার সহিংস অপরাধে জড়িতদের ক্ষেত্রে আরও বিকল্প ব্যবস্থা এবং উচ্চঝুঁকির কিশোরদের মুক্তির আগে আরও যাচাই-বাছাইয়ের দাবি রয়েছে।
মেয়র কার্ল শেলিন গত মাসে এক বিবৃতিতে বলেছেন, বাড়তি সম্পদ বরাদ্দের মাধ্যমে বন্দুকসহিংসতায় জড়িতদের প্রতি শক্ত বার্তা যাচ্ছে: “আমরা তোমাদের খুঁজে বের করব।” তবে তিনি এও যোগ করেছেন, শহরে কিশোর বন্দুকসহিংসতা কমাতে অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা ও জবাবদিহি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে সাবেক সিটি কাউন্সিল প্রেসিডেন্ট ও রিপাবলিকান মেয়রপ্রার্থী রিক ল্যাশাপেল সমস্যার মূলে “ভাঙা ব্যবস্থাকেই” দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, পুলিশ বিভাগ অপরাধীদের ধরতে চমৎকার কাজ করছে; এক তরুণের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, একই অপরাধে তাকে অন্তত পাঁচবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে, কিন্তু প্রতিবারই যুবকেন্দ্রে নেওয়ার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ল্যাশাপেলের যুক্তি, দীর্ঘদিনের একদলীয় শাসন এমন নিয়ম তৈরি করেছে যেখানে জবাবদিহি নেই, এবং এই ব্যবস্থার নিয়ম বদলানো দরকার। তবে মেয়র শেলিনের কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তিনি সাড়া দেননি বলে জানানো হয়েছে।
সহিংসতার কারণ নিয়ে শহরে বিতর্কও চলছে। শহর বা পুলিশের কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য এমন ইঙ্গিত দেয় না যে সোমালি বাসিন্দারা একটি গোষ্ঠী হিসেবে এই সহিংসতার পেছনে রয়েছে কিংবা এর বৃদ্ধির সঙ্গে তাদের কোনো সংযোগ আছে। রাস্তায় কথা বলা কিশোর মোহামেদ আদবেই এই জাতিগত সংযোগের ধারণা প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, “আমি শুধু বলব না এটা সোমালি ছেলেদের কাজ। এটা সামগ্রিকভাবে তরুণদের বিষয়।”
আটলান্টা থেকে লিউইস্টনে আসা সোমালি বংশোদ্ভূত ইফরাক্স সাসিদও একই মত দিয়েছেন। তার মতে, মূল কারণ সোমালি সম্প্রদায় নয়, বরং লিউইস্টনের দারিদ্র্য; শহরটি খুব গরিব এবং অর্থনৈতিকভাবে ভালো অবস্থায় নেই। তিনি বলেন, এখানে যা ঘটছে তা সর্বত্রই ঘটছে—আটলান্টা, মিয়ামি, ওহাইও, কেনটাকি ও মিনেসোটাতেও তিনি একই চিত্র দেখেছেন।
লিউইস্টনে সোমালিদের আগমন শুরু হয়েছিল প্রায় পঁচিশ বছর আগে, যখন শরণার্থী ও দ্বিতীয় ধাপের অভিবাসীরা নিরাপদ পাড়া ও সাশ্রয়ী আবাসনের খোঁজে আন্দ্রোসকগিন নদীর তীরের সাবেক মিল শহরটিতে আসতে শুরু করেন। ২০০২ সালে তৎকালীন মেয়র ল্যারি রেমন্ড সোমালি নেতাদের অতিরিক্ত অভিবাসন নিরুৎসাহিত করতে বলায় জাতীয় মনোযোগ কেড়েছিলেন; তার যুক্তি ছিল, দ্রুত আগমন শহরের সম্পদের ওপর চাপ ফেলছে। বর্তমানে লিউইস্টনে মাথাপিছু মুসলিম জনসংখ্যার হার দেশের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ, যাদের বেশিরভাগই সোমালি ও অন্যান্য আফ্রিকান দেশের শরণার্থী।
শহরটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মেইনের যৌথ ফেডারেল-রাজ্য মেডিকেইড কর্মসূচি ঘিরে জালিয়াতি কেলেঙ্কারির কেন্দ্রেও ছিল। তবে সাসিদ জোর দিয়ে বলেছেন, জালিয়াতি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বত্র এবং সব বর্ণ ও শ্রেণির মানুষের মধ্যেই ঘটে—এটি কোনো একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত নয়। সামনে শহর কর্তৃপক্ষের বাড়তি টহল ও বিচারব্যবস্থা সংস্কারের দাবি কতটা ফল দেয়, সেটাই এখন লিউইস্টনের বাসিন্দাদের অপেক্ষা।





