ডেঙ্গুতে আক্রান্ত বেশি পুরুষ, মৃত্যু বেশি নারীর: এক দিনে আরও ৩ মৃত্যু, ভর্তি ১ হাজার ২৯৯ জন
দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যানে নারী-পুরুষের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের বড় অংশ পুরুষ হলেও মৃত্যুর হিসাবে নারীর সংখ্যা বেশি বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লিঙ্গভিত্তিক তথ্য।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। আর নতুন করে ১ হাজার ২৯৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছরে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৭১।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে শুক্রবার পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে পুরুষের হার ৬২ দশমিক ১ শতাংশ এবং নারীর হার ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে মৃতদের মধ্যে নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের অসুস্থতাকে গুরুত্ব না দেওয়া, চিকিৎসা নিতে বিলম্ব, আর্থিক সংকট এবং স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক বাধা এ পরিস্থিতির পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে মা ও অনাগত শিশুর জন্যও বাড়তি জটিলতার আশঙ্কা থাকে।
বয়সভেদে আক্রান্ত ও মৃত্যুর চিত্রেও একই ধরন দেখা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বয়সভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে ২৬ থেকে ৫০ বছর বয়সিদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এ বয়সসীমার বিভিন্ন শ্রেণির তথ্য যোগ করে আক্রান্তের সংখ্যা পাওয়া যায় ৫২ হাজার ৫৩১। তাদের মধ্যে পুরুষ ৩১ হাজার ৮২৭ জন এবং নারী ২০ হাজার ৭০৪ জন।
একই বয়সসীমায় মৃত্যুর হিসাবেও নারীর সংখ্যা বেশি। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, এ বয়সি মৃতদের মধ্যে পুরুষ ৭৫ জন এবং নারী ৯৮ জন। অর্থাৎ এই বয়সসীমায় নথিভুক্ত মৃত্যুর প্রায় ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ নারী।
বিশিষ্ট রোগতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, ডেঙ্গুতে নারীদের মৃত্যুর পেছনে সামাজিক বৈষম্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবারের পুরুষ সদস্যদের তুলনায় অনেক নারী নিজেদের অসুস্থতাকে কম গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেও তাঁরা সব সময় প্রয়োজনীয় যত্ন ও চিকিৎসার বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব পান না।
বিশেষ করে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের নারীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসার খরচ, সংসারের দায়িত্ব এবং শিশুদের দেখাশোনার বিষয়টি চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে জ্বর বা অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরও তাঁরা চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করতে পারেন।
ডেঙ্গুতে রোগীর অবস্থা কখনো কখনো দ্রুত জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং রোগের সতর্কসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া জরুরি। চিকিৎসা নিতে দেরি হলে রোগীর প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা শুরু করতেও বিলম্ব হতে পারে।
তবে নারীদের বেশি মৃত্যুর পেছনে চিকিৎসা নিতে দেরিই একমাত্র কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত তথ্য নেই। এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তের জন্য লিঙ্গভিত্তিক মৃত্যুহার, রোগীর শারীরিক অবস্থা, হাসপাতালে পৌঁছানোর সময় এবং চিকিৎসার তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
রাজধানীর মাতুয়াইলের মা ও শিশু ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. তাহমিনা ডেইজি বলেন, গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু হলে মা ও শিশু উভয়েরই গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি থাকতে পারে। এ সময় রোগীর শারীরিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
ডেঙ্গুতে রক্তের অণুচক্রিকা কমে যাওয়া, রক্তক্ষরণ ও যকৃতের জটিলতার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। গর্ভাবস্থায় সংক্রমণ হলে মায়ের অবস্থার পাশাপাশি গর্ভের শিশুর সুস্থতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে গর্ভপাত, সময়ের আগে সন্তান জন্ম নেওয়া কিংবা নবজাতকের কম ওজনের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে ডেঙ্গু আক্রান্ত সব গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে এসব জটিলতা দেখা দেয় না।
নারীদের পুষ্টির ঘাটতি ও রক্তস্বল্পতার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন ডা. তাহমিনা ডেইজি। তাঁর মতে, নারীরা অনেক সময় সংসারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজেদের অসুস্থতাকে উপেক্ষা করেন। পরিবার থেকেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পেলে চিকিৎসা নেওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, ডেঙ্গুতে মৃত্যু কমাতে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়াতে হবে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে দ্রুত রোগ শনাক্ত, পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে আক্রান্ত ও মৃত্যুর এই চিত্র ডেঙ্গু প্রতিরোধের পাশাপাশি দ্রুত রোগ শনাক্ত এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে। নারীদের অসুস্থতাকে গুরুত্ব দেওয়া, আর্থিক ও সামাজিক বাধা কমানো এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে ডেঙ্গুজনিত জটিলতা মোকাবিলায় ইতিবাচক অগ্রগতি সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।




