কানাডায় ভুয়া কাগজে ভিসা আবেদনের চক্র: ২৪৩টি আবেদন, পাঁচ বাংলাদেশির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা
কানাডায় জাল নথিপত্র ব্যবহার করে ভিজিটর ভিসা আবেদনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র উন্মোচন করেছে দেশটির সীমান্ত সুরক্ষা সংস্থা সিবিএসএ। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এই চক্রটি কানাডীয় নাগরিকদের ভুয়া আতিথেয়তাকারী বা 'হোস্ট' সাজিয়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য বিপুল সংখ্যক ভিসা আবেদন জমা দিয়েছিল।
ঘটনায় অভিবাসন-সংক্রান্ত জালিয়াতির অভিযোগে চার বাংলাদেশি ও তাদের এক সহযোগীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে। একই তদন্তে জাল কাগজপত্র দিয়ে কানাডার সাময়িক রেসিডেন্স ভিসা, অর্থাৎ টিআরভি আবেদনের চেষ্টার সঙ্গে জড়িত ২০৯ জন বাংলাদেশি নাগরিককেও শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সিবিএসএ।
সিবিএসএর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ অক্টোবর ভ্যালিফিল্ড আদালতে অভিযুক্ত চার ব্যক্তি উপস্থিত হন। তারা হলেন রাসেল মির্জা, মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম, মো. মুদাচ্ছার আলম ভূঁইয়া এবং কাজী নাফিজ আলম।
মামলার পঞ্চম অভিযুক্ত মো. রকিবুল হাসান বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। তার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে, ফলে মামলার কার্যক্রমে তার অবস্থান একটি আলাদা প্রশ্ন হয়ে থাকছে।
এই তদন্তের সূচনা হয় ২০২৪ সালের ৩ জুলাই। সেদিন সিবিএসএ মেরসিয়ার শহরের পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে মার্সিয়ারের একটি আবাসিক বাড়িতে তল্লাশি চালায়। সেখানে অভিবাসন ও শরণার্থী সুরক্ষা আইন, অর্থাৎ আইআরপিএর কয়েকটি লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললে ওই বছরের আগস্ট মাস থেকে সিবিএসএ আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করে।
তদন্তে উঠে আসে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ভুয়া হোস্টের ব্যবস্থা করে ২০৯ জন বাংলাদেশি নাগরিকের জন্য মোট ২৪৩টি ভিজিটর ভিসার আবেদন জমা দিয়েছিলেন। ভুয়া কাগজপত্র ও মিথ্যা তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে একটি বিস্তৃত প্রতারণামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের ভাষ্য।
এরপর ২০২৫ সালের ৩ জুন ক্যুবেক ও অন্টারিওতে চারটি তল্লাশি পরোয়ানা কার্যকর করা হয়। সেই অভিযানে পুলিশ বিপুল নথিপত্র ও কম্পিউটার সরঞ্জাম বাজেয়াপ্ত করে। জালিয়াতির পরিধি বড় হওয়ায় তদন্তকারীরা সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণসম্পন্ন ৭৯টি ভিসা আবেদনকে কেন্দ্র করে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যান।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে জালিয়াতির মাধ্যমে একাধিক ব্যক্তিকে কানাডায় প্রবেশে সহায়তা করা, ভিসা নথিতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লুকিয়ে মিথ্যা তথ্য দিতে প্ররোচিত করা এবং দেশটির অভিবাসন আইন ভাঙতে সহযোগিতা করা।
অভিযান নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন কানাডার জননিরাপত্তামন্ত্রী গ্যারি আনন্দসঙ্গরী। তিনি বলেছেন, কানাডার অভিবাসন ব্যবস্থা সততা, ন্যায্যতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধার ওপর প্রতিষ্ঠিত; যারা জালিয়াতি করে এই ব্যবস্থাকে ব্যবহার করতে চায়, তাদের কঠোর পরিণতি ভোগ করতে হবে। সীমান্ত সুরক্ষায় নিরলস কাজের জন্য তিনি সিবিএসএ কর্মীদের ধন্যবাদও জানান।
সিবিএসএর ক্যুবেক অঞ্চলের আঞ্চলিক মহাপরিচালক এরিক ল্যাপিয়েরে বলেছেন, এই তদন্ত সংস্থাটির সেই সংকল্পই তুলে ধরে, যা অভিবাসন ব্যবস্থার সুযোগ নেওয়া চক্রগুলোকে শনাক্ত ও ধ্বংস করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তার ভাষায়, অপরাধ তদন্তকারীদের কাজ জনগণের আস্থা ধরে রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে।
সিবিএসএ জানিয়েছে, আইআরপিএ ভঙ্গের দায়ে অপরাধ প্রমাণিত হলে জরিমানা, কানাডায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা কিংবা কারাদণ্ড হতে পারে। সংস্থাটি ২০২৫ সালে আইআরপিএ লঙ্ঘনের অভিযোগে ১৯১টি এবং ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে আরও ৫৫টি অপরাধমূলক তদন্ত শুরু করেছে।
এই মামলা বাংলাদেশ থেকে কানাডায় যেতে আগ্রহীদের জন্য একটি কঠিন সতর্কবার্তা। ভুয়া কাগজপত্রের পথে ভিসা পাওয়ার চেষ্টা শুধু আবেদন বাতিলের ঝুঁকিই তৈরি করে না, বরং ভবিষ্যতে প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা এবং ফৌজদারি বিচারের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি করে। আদালতে মামলাটির পরবর্তী কার্যক্রমের দিকেই এখন নজর থাকবে।






