সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও চড়ছে চালের দাম: এক সপ্তাহে কেজিতে বাড়তি ১ থেকে ৩ টাকা
রাজধানীর বাজারে এক সপ্তাহের ব্যবধানে আবার বেড়েছে চালের দাম। জাত ও মানভেদে প্রতি কেজি চাল কিনতে এখন ক্রেতাদের ১ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বেশি খরচ করতে হচ্ছে। বাজারে চালের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও বাড়তি দামে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ; বিশেষ করে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর মাসিক বাজেটে চাপ আরও বেড়েছে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাজধানীর শনিরআখড়া ও যাত্রাবাড়ী এলাকার বাজারের চালের দোকানগুলোতে দেখা যায়, ক্রেতারা বিভিন্ন জাতের চালের দর যাচাই করছেন। কেউ খুঁজছেন কম দামের মোটা চাল, কেউ আবার বাজেটের মধ্যে ভালো মানের মাঝারি চাল কেনার চেষ্টা করছেন। দোকানিরা নানা জাতের দাম জানাচ্ছেন, আর ক্রেতারা এক দোকান থেকে অন্য দোকানে গিয়ে দাম তুলনা করছেন।
বাজারে চালের অভাব না থাকলেও আগের দামে কেনার সুযোগ কমেছে। মোটা চালের দাম তুলনামূলক কম থাকলেও মাঝারি ও সরু চাল কিনতে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। অন্যদিকে সুগন্ধি চালের দাম সাধারণ চালের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে পরিবারের প্রয়োজন ও সামর্থ্য বিবেচনা করেই চালের ধরন বেছে নিচ্ছেন ক্রেতারা।
ব্যবসায়ীরা জানান, গুটি স্বর্ণা ও চায়না ইরির মতো মোটা চাল কেজিপ্রতি ৫১ থেকে ৫৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি মানের বিআর-২৮ চালের দাম ৬২ থেকে ৬৬ টাকা এবং পাইজাম চাল ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা। সরু চালের মধ্যে মিনিকেট মান ও ব্র্যান্ডভেদে ৭০ থেকে ৮০ টাকা এবং নাজিরশাইল ৭৪ থেকে ৯৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
তবে একই জাতের চালের দাম সব দোকানে এক নয়। চালের মান, উৎপাদনকারী মিল, ব্র্যান্ড এবং কেনার সময়ের ওপর দাম নির্ভর করে। যেসব দোকানে পুরোনো মজুতের চাল রয়েছে, সেখানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আগের দামে বিক্রি সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু নতুন করে চাল কিনতে গেলে বাড়তি দাম দিতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
মোটা চালের দাম তুলনামূলক কম থাকায় সীমিত আয়ের অনেক পরিবার এ ধরনের চালের দিকে ঝুঁকছে। তবে যেসব পরিবার দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট জাতের চাল খেতে অভ্যস্ত, তাদের পক্ষে সহজে চালের ধরন বদলানো সম্ভব হচ্ছে না।
চালের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে পরিবহন ব্যয় ও পাইকারি বাজারের দামের পরিবর্তনের কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা। দেশের বিভিন্ন মোকাম থেকে ঢাকায় চাল আনতে ট্রাকভাড়া ও অন্যান্য পরিবহন খরচ বাড়লে তার প্রভাব পড়ে পাইকারি ও খুচরা বাজারে। তবে সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি না থাকায় দাম বাড়ার কারণ হিসেবে চালের সংকটকে দেখছেন না তাঁরা।
শনিরআখড়ার সবুজ রাইস এজেন্সির ম্যানেজার আব্দুস সোবাহান বলেন, ‘আমাদের চাল কিনতে হচ্ছে আগের চেয়ে বেশি দামে। পরিবহন খরচও বেড়েছে। ফলে আগের দামে বিক্রি করলে লাভ থাকে না। তবে বাজারে চালের অভাব নেই।’
যাত্রাবাড়ীর ব্যবসায়ী রমজান হোসেন বলেন, ‘পাইকারি বাজারে দাম বাড়লে খুচরা পর্যায়েও তার প্রভাব পড়ে। কিন্তু দাম বাড়লেই যে বাজারে চালের সংকট রয়েছে, তা নয়। নিয়মিত চাল আসছে। কেনার খরচ কমলে বিক্রির দামও কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।’
ক্রেতারা বলছেন, ব্যবসায়ীদের এসব বক্তব্যের সঙ্গে বাজারের প্রকৃত দাম-পরিবর্তন মিলিয়ে দেখা জরুরি। পরিবহন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব কতটা পড়ছে এবং পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে কত টাকার ব্যবধান থাকছে, তা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। তাঁদের অভিযোগ, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও দাম বাড়লে তার যৌক্তিকতা যাচাই করা উচিত; শুধু চালের বাজার নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতেও নিয়মিত নজরদারি থাকা দরকার।
চালের দাম বাড়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নিয়মিত চাল কিনতে হয় এমন পরিবারগুলোর ওপর, কারণ চালের ব্যবহার সহজে কমানো যায় না। পরিবারের সদস্যসংখ্যা অনুযায়ী মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাল কিনতেই হয়। কোনো পরিবার মাসে ৬০ কেজি চাল কিনলে কেজিতে ২ টাকা দাম বাড়ায় মাসে অতিরিক্ত ১২০ টাকা খরচ হবে; ৭০ কেজি কিনলে বাড়তি ব্যয় দাঁড়াবে ১৪০ টাকা। চালের পাশাপাশি অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামও বেশি থাকায় এই অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
শনিরআখড়ার বাসিন্দা ক্রেতা সানাউল হক বলেন, ‘চাল এমন একটি পণ্য, যেটা প্রতিদিন লাগে। অন্য কিছু কম কিনলেও চালের পরিমাণ খুব বেশি কমানো যায় না। দাম একটু একটু করে বাড়লে মাস শেষে তার প্রভাব বোঝা যায়। বাজার করতে এসে এখন সবকিছুর হিসাব মিলিয়ে চলতে হচ্ছে।’
যাত্রাবাড়ীর ক্রেতা আল কায়েস বলেন, ‘একই চাল কিনতে আগের চেয়ে বেশি টাকা লাগছে। দোকানভেদেও দামের পার্থক্য আছে। তাই কেনার আগে কয়েকটি দোকানে দাম জেনে নিতে হয়। চালের বাজারে দাম যেন অকারণে না বাড়ে, সেটি দেখা দরকার।’ আরেক ক্রেতা আতাউর রহমান বলেন, কোন পর্যায়ে দাম বাড়ছে এবং বাড়তি দামের পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা যাচাই করা হলে বাজার সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যাবে।
সাধারণ চালের পাশাপাশি সুগন্ধি বা পোলাও চালের দামও ক্রেতাদের আলোচনায়। চিনিগুঁড়া ও কালিজিরাসহ বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি চালের দাম ব্র্যান্ড ও মানভেদে অনেক বেশি; প্যাকেটজাত সুগন্ধি চালের কোনো কোনো ব্র্যান্ডের দাম কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ২৩০ টাকা পর্যন্ত, আর খোলা সুগন্ধি চাল মানভেদে ১৮০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতারা মনে করেন, সুগন্ধি চালের দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি হলেও তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বাজারসংশ্লিষ্টদের নজর এখন নতুন আমন ধানের দিকে। নতুন ধান ওঠা শুরু হলে চাল উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে; এতে বাজারে দামের চাপ কমতে পারে। তবে নতুন ধান উঠলেই খুচরা বাজারে চালের দাম সঙ্গে সঙ্গে কমবে — এমন নিশ্চয়তা নেই। ধান সংগ্রহের খরচ, চালকলের উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন ও বাজারের চাহিদার ওপরও দাম নির্ভর করবে।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, নতুন আমনের সরবরাহ বাড়লে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে তার আগে চালের দাম স্থিতিশীল রাখতে বাজারের বিভিন্ন পর্যায়ে নজরদারি প্রয়োজন — বিশেষ করে মিলগেট, পাইকারি আড়ত ও খুচরা দোকানে ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান পর্যবেক্ষণ করা দরকার। কোনো পর্যায়ে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানো হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা গেলে বাজার ব্যবস্থাপনায় সহায়তা হবে। আপাতত চাল পাওয়া গেলেও আগের দামে কেনার স্বস্তি নেই ক্রেতাদের।






