ইইউ-কানাডা ‘প্রেমের গল্প’ শুধু কথায় থামলে চলবে না, সতর্ক করলেন জ্যেষ্ঠ এমইপি
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কানাডার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে শুধু উষ্ণ কথাবার্তায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব প্রতিশ্রুতিতে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের কানাডাবিষয়ক স্থায়ী প্রতিনিধি টোবিয়াস ক্রেমার। ইউরোনিউজকে তিনি বলেছেন, প্রস্তাবিত ‘সহযোগী সদস্যপদ’ হতে হবে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোসহ অর্থবহ অংশীদারত্ব।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন গত সেপ্টেম্বরে কানাডাকে ইইউর প্রথম ‘সহযোগী সদস্য’ হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তবে সেই অভূতপূর্ব মর্যাদা বাস্তবে কী অর্থ বহন করবে, সে বিষয়ে তখন খুব বেশি ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি।
ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ব্রাসেলস ও অটোয়াকে কাছাকাছি টেনে এনেছে। কানাডা তার ঐতিহ্যবাহী মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, আর ইউক্রেন প্রশ্নে ওয়াশিংটনকে পাশে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে ইইউ। এই প্রেক্ষাপটেই দুই পক্ষের ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে।
আগামী সপ্তাহের শেষ দিকে মন্ট্রিয়লে দুই পক্ষের শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল ও ডিজিটাল সহযোগিতাসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে চুক্তি হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
জার্মান সমাজতান্ত্রিক এমইপি ক্রেমার বলেন, গত কয়েক মাস ধরে কানাডা ও ইউরোপ একে অপরকে ‘প্রেমপত্র’ লেখায় ও একসঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা জানানোয় খুব ভালো করেছে। তবে এখন সত্যিই গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে এবং সেই গল্পকে বাস্তব প্রতিশ্রুতিতে পরিণত করতে হবে।
তার ভাষায়, সহযোগী সদস্যপদ মানে হতে হবে অ-ইউরোপীয় কোনো দেশকে ইইউর পক্ষ থেকে দেওয়া সম্ভাব্য সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব। কানাডা সম্ভবত অ-ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইউরোপীয়, তাই সেই ঘনিষ্ঠতা হওয়া উচিত খুবই গভীর।
ক্রেমার জোর দিয়ে বলেছেন, এই সম্পর্ক শুধু একটি ‘বাণিজ্য চুক্তি প্লাস’ হলে চলবে না। সম্পর্কে একটি নতুন গুণগত মাত্রা থাকতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, ডিজিটাল সহযোগিতা, আর্কটিক ও শিক্ষার্থীদের মতো ক্ষেত্রে খাতভিত্তিক চুক্তির মাধ্যমে একটি বাস্তবসম্মত পথের কথা বলেছেন। তবে সেখানেই থেমে না থেকে এসব উদ্যোগকে আরও টেকসই একটি যৌথ প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও সহযোগিতার কাঠামোর মধ্যে বাঁধার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
তার একটি প্রস্তাব হলো, জাতীয় মন্ত্রীদের বৈঠকস্থল ইইউ কাউন্সিলে কানাডা ‘পর্যবেক্ষক’ হিসেবে অংশ নিতে পারে। পাশাপাশি একটি আনুষ্ঠানিক সংসদীয় অংশীদারত্ব পরিষদ গঠনের কথাও বলেছেন তিনি।
এমন একটি সংস্থা বিদ্যমান ইইউ-যুক্তরাজ্য সংসদীয় অংশীদারত্ব পরিষদের আদলে হতে পারে, যেখানে দুই পক্ষের ৩৫ জন করে সদস্য বছরে দুবার নির্দিষ্ট নীতিক্ষেত্র নিয়ে বৈঠকে বসেন।
যুক্তরাজ্য প্রসঙ্গে অবশ্য ক্রেমারের অবস্থান আলাদা। তার মতে যুক্তরাজ্য একটি ইউরোপীয় দেশ, তাই দেশটি চাইলে তার লক্ষ্য হওয়া উচিত সহযোগী সদস্যপদ নয়, পূর্ণ সদস্যপদ। সম্প্রতি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম ইইউতে ফের যোগ দেওয়ার ধারণা তুলেছেন, আর জরিপে দেখা গেছে অধিকাংশ ব্রিটিশ এখন ব্লকে ফিরতে চান।
ক্রেমার শুধু যুক্তরাজ্য ও কানাডা নয়, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার পক্ষে মত দিয়েছেন। তার যুক্তি, বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ সম্মিলিত নিরাপত্তা, অভিন্ন স্বার্থ ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে একবিংশ শতাব্দীর রাজনীতি চায়, ‘শক্তিই অধিকার’ নীতিতে নয়। মন্ট্রিয়ল সম্মেলনেই এখন দেখা যাবে, এই আহ্বান কতটা বাস্তব রূপ পায়।





