পার্লামেন্ট পাস করা গর্ভপাত বিলে প্রিন্সের প্রথম ভেটো, হতাশ লিখটেনস্টাইনের অধিকারকর্মীরা
ইউরোপের ছোট্ট দেশ লিখটেনস্টাইনের যুবরাজ আলোইস তাঁর শাসনামলে প্রথমবারের মতো ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে পার্লামেন্টে পাস হওয়া একটি গর্ভপাত আইন সংস্কার বিল আটকে দিয়েছেন। গণআবেদনের সমর্থন পাওয়া বিলটি পাস হলে দেশটির গর্ভপাত আইন ইউরোপের বেশির ভাগ দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার কথা ছিল।
গত মাসে লিখটেনস্টাইনের পার্লামেন্ট বিলটি অনুমোদন করেছিল। এর আগে দেশটির মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশের সই করা একটি নাগরিক উদ্যোগ পার্লামেন্টে উপস্থাপন করা হয়। সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতাতেই বিলটি পার্লামেন্টে ওঠে ও পাস হয়।
খবরটি অধিকারকর্মীদের মধ্যে তীব্র হতাশা তৈরি করেছে। উদ্যোগটির নেতৃত্ব দেওয়া এবং ছোট বামপন্থী দল ফ্রি লিস্টের সঙ্গে যুক্ত তাতিয়ানা আস’আদ বলেন, ‘আমরা আসলে বিস্মিত নই, তবে হতাশ অবশ্যই। ২০২৬ সালে ইউরোপের মাঝখানে একটি রাষ্ট্রে যা ঘটছে, তা অবাস্তব মনে হয়।’
তাঁর মতে, এই ভেটো বাস্তবে গর্ভপাত থামাতে তেমন কিছুই করবে না। তিনি বলেন, ‘লিখটেনস্টাইনে এমন অবস্থা চলতেই থাকবে যেখানে গর্ভপাত নিষিদ্ধ, অথচ আমরা জানি তা ঘটছেই। ভেটোর অর্থ হলো, সেগুলো বিদেশে গিয়েই হতে থাকবে।’
রাজত্বটিতে গর্ভপাত কেবল সীমিত কিছু ক্ষেত্রেই বৈধ—যেমন নারীর জীবন ঝুঁকিতে থাকলে কিংবা ধর্ষণের ফলে গর্ভধারণ হলে। ২০১৫ সাল থেকে নারীদের আইনত বিদেশে গিয়ে গর্ভপাত করানোর অনুমতি রয়েছে, যাতে বিধিনিষেধ এড়ানো যায়।
ফেব্রুয়ারিতে অধিকারকর্মীরা নাগরিক উদ্যোগটি শুরু করার পর ৪ হাজার ৯৭০ জনের বেশি মানুষ তাতে সই করেন—যা পার্লামেন্টে পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় ১ হাজার সইয়ের চেয়ে অনেক বেশি। উদ্যোগটিতে ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত গর্ভপাতকে অপরাধমুক্ত করা, স্বাস্থ্যবিমার আওতায় এই সেবা আনা এবং গর্ভপাতের সুযোগ সম্পর্কে তথ্য জানানোর ওপর দেশব্যাপী নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি ছিল।
বিদেশে যেতে বাধ্য হওয়ায় নারীদের যেসব বাধার মুখে পড়তে হয়—খরচ, শিশুর দেখাশোনার ব্যবস্থা করা এবং যানবাহনের অভাব—সেগুলো দূর করাই ছিল সংস্কারের লক্ষ্য। অনেক নারীকে প্রতিবেশী অস্ট্রিয়া বা সুইজারল্যান্ডে যেতে হয় এই সেবার জন্য।
উদ্যোগটি গতি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যুবরাজ আলোইস জানিয়ে দিয়েছিলেন, আইন সংস্কারের যেকোনো উদ্যোগ তিনি ভেটো দিয়ে আটকাবেন। সেই হুমকি উদ্যোগটির ওপর ছায়া ফেললেও পার্লামেন্ট সদস্যরা শেষ পর্যন্ত সংকীর্ণ ব্যবধানে বিলটির পক্ষে ভোট দেন। কিন্তু প্রিন্সের ভেটোতে সেই সিদ্ধান্ত থমকে গেল।
এই সপ্তাহে দেওয়া বিবৃতিতে আলোইস গর্ভপাতসংক্রান্ত তথ্যের ওপর দেশব্যাপী নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাবও প্রকাশ করেছেন। এতে ইঙ্গিত মিলেছে, ভবিষ্যতে নারীরা হয়তো নিজের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর কাছ থেকে বিদেশে কোথায় এই সেবা পাওয়া যাবে সে সম্পর্কে পরামর্শ নিতে এবং পরে সহায়তা পেতে পারবেন।
তবে অধিকারকর্মী আলভারেজ-হুমেল আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বছরে আনুমানিক ৪০ জন নারীকে এখনো বিদেশে গিয়ে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে এবং তাঁদের আরও বেশি কলঙ্ক ও গভীরভাবে প্রোথিত নিষেধাজ্ঞা-সংস্কৃতির মুখে পড়তে হতে পারে। তাঁর ভাষায়, ‘আপনি এমন একটি দেশে থাকেন যেখানে এটি নিষিদ্ধ, যেখানে দুর্গে বসবাসকারী প্রিন্স নিশ্চিত করেছেন এটি নিষিদ্ধই থাকবে। তিনি তাঁর একমাত্র ভেটোটি ব্যবহার করেছেন এর বিরুদ্ধেই—তাদের জন্য বিষয়টি কতটা কঠিন, তা আমি কল্পনাই করতে পারি।’
প্রসঙ্গত, লিখটেনস্টাইন ছিল ইউরোপের শেষ দেশ যেখানে নারীরা জাতীয় নির্বাচনে ভোটাধিকার পান—১৯৮৪ সালে। আস’আদ বলেন, ‘নারীর অধিকারের ক্ষেত্রে লিখটেনস্টাইনের ইতিহাস হলো সবার শেষে থাকার। আমি আশা করেছিলাম, গর্ভপাতের অধিকারের ক্ষেত্রেও আমরা শেষ হব না, কিন্তু এই মুহূর্তে পরিস্থিতি ভালো দেখাচ্ছে না।’
তবে প্রচারণাটি কিছু সাফল্যও পেয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, কয়েক দশক ধরে এই বিষয়ে কথা বলার যে নিষেধাজ্ঞা-সংস্কৃতি ছিল, তা ভাঙতে সাহায্য করেছে এই উদ্যোগ। এখন দেখার বিষয়, ভেটোর পর সংস্কারপন্থীরা পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে কোন পথ বেছে নেন।





