শাহ আবদুল করিমের দিরাইয়ে আপত্তির মুখে বাতিল বাউল গানের ঘরোয়া আসর
বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের স্মৃতিবিজড়িত সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় একটি পক্ষের আপত্তিতে বন্ধ হয়ে গেছে একটি ঘরোয়া গানের আসর। উপজেলার হাতিয়া-রাধানগর গ্রামে একটি মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দুই নারী বাউলশিল্পীর গান করার কথা ছিল, কিন্তু লিখিত আপত্তির পর আয়োজক অনুষ্ঠানটি বাতিল করে দিয়েছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, হাতিয়া গ্রামের যুক্তরাজ্যপ্রবাসী শওকত আলী মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে নিজ বাড়িতে ছোট পরিসরে গানের আয়োজন করেছিলেন। সেখানে স্থানীয় দুই নারী বাউলশিল্পী তানিশা ও নীলার গান গাওয়ার কথা ছিল।
এই আয়োজনে আপত্তি জানিয়ে বুধবার গ্রামবাসীর পক্ষে দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কাছে লিখিত আবেদন করেন আতাহার আলী ও কামরুল হাসান। পরে পুলিশ শওকত আলীর সঙ্গে কথা বলে। এরপর শওকত আলী অনুষ্ঠান বাতিল করেন।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়, হাতিয়া গ্রাম দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ইসলামী ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত। গ্রামে একটি আলিম মাদ্রাসা ও একজন ওলির মাজার রয়েছে, বসবাস করেন অনেক আলেম-ওলামা। আবেদনকারীদের দাবি, নারী শিল্পীদের গানের আয়োজন চলতে থাকলে এলাকায় উত্তেজনা ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। গ্রামের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান।
অভিযোগকারী কামরুল হাসান বলেন, তাদের গ্রামে আগে গানবাজনা হলেও এখন এ ধরনের আয়োজন হয় না। গ্রামে মসজিদ-মাদ্রাসা আছে, প্রতিবছর ওয়াজ মাহফিল হয়। নারী শিল্পীদের নিয়ে গানের আয়োজনের কারণে গ্রামবাসীর মধ্যে অসন্তোষ ও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। অনেকেই মনে করেন, গানের নামে অশ্লীলতা হতে পারে। এ কারণে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে অনুষ্ঠানটি বন্ধ রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে আয়োজক শওকত আলী জানান, মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে তিনি বাড়িতে ছোট পরিসরে গানের আয়োজন করেছিলেন। আপত্তি ওঠায় এবং থানা থেকে ফোন করায় সামাজিক সম্প্রীতির কথা বিবেচনা করে তিনি নিজেই অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছেন।
দিরাই থানার ওসি আমিনুল ইসলাম বলেন, তিনি খোঁজ নিয়ে দেখেছেন, এটি ছিল বাউলগানের একটি ঘরোয়া আয়োজন। কিন্তু আপত্তি ওঠার পর পুলিশ আয়োজকের সঙ্গে কথা বলে, পরে আয়োজক নিজেই জানিয়েছেন তিনি গানবাজনা করবেন না। পুলিশের পক্ষ থেকে জোর করে অনুষ্ঠান বন্ধ করা হয়নি বলেও তার বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে।
উল্লেখ্য, দিরাই শাহ আবদুল করিমের স্মৃতিধন্য এলাকা। বাউলগানের এই প্রাণকেন্দ্রে নারী বাউলশিল্পীদের ঘরোয়া আসর বাতিলের ঘটনা স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জন্মদিনের মতো একটি পারিবারিক উপলক্ষের ছোট আয়োজনও আপত্তির মুখে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
এর আগেও দিরাইয়ে একই ধরনের বাধার ঘটনা ঘটেছে। ‘দিরাইয়ে ইসলামবিরোধী কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটি’র বাধার মুখে দিরাই উপজেলা সদরের স্টেডিয়ামে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বাতিল করতে হয়েছিল। গত ৫ অক্টোবর স্থানীয় স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাব ও সিলেটের জারা স্পোর্টিং ক্লাবের মধ্যে ম্যাচটি হওয়ার কথা ছিল। বিষয়টি নিয়ে তখন ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়।
পরপর এসব ঘটনায় দিরাইয়ে সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া আয়োজন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এক পক্ষ ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির কথা বলছেন, অন্য পক্ষ ঘরোয়া ও বৈধ আয়োজনে বাধা দেওয়াকে সংস্কৃতিচর্চার পরিপন্থী বলে মনে করছেন।
সব মিলিয়ে জন্মদিনের ঘরোয়া বাউল আসর বাতিলের ঘটনাটি দিরাইয়ের চলমান সাংস্কৃতিক বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আয়োজক স্বেচ্ছায় অনুষ্ঠান বন্ধ করায় এ নিয়ে আর কোনো আইনি জটিলতা তৈরি হয়নি, তবে এলাকায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।


