অপ্রতিম হত্যা: ৩১ দিনে আদালতে অভিযোগপত্র, চার আসামির দুজন কিশোর, পরিবারের চাওয়া সর্বোচ্চ শাস্তি
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ। মরদেহ উদ্ধারের ৩১ দিনের মাথায় দেওয়া এই অভিযোগপত্রে দুই কিশোরসহ চারজনের নাম রয়েছে। এখন মামলার বিচার শুরুর অপেক্ষায় পরিবার; তাদের একটাই প্রত্যাশা—দ্রুত বিচার শেষ করে হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে অভিযোগপত্র দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেন জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান। তিনি জানান, ২০ অক্টোবর দুই কিশোরসহ চার আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং তদন্তে চারজনের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।
অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়েছে সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯) ও মো. সিয়ামকে (১৯), সঙ্গে রয়েছে ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী দুই কিশোর। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। শিশু আইন অনুযায়ী দুই কিশোরকে অভিযোগপত্রে ‘শিশু’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলাটির তদন্ত করেছেন কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাজীব আহমেদ; তিনি ছিলেন মামলার দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তা।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তুহিন হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও প্রধান অভিযুক্ত। পরিকল্পনায় তার সঙ্গে সিয়ামও যুক্ত ছিলেন। হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তিনজনের বিরুদ্ধে, আর সিয়াম সহযোগিতা করেছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
তুহিন ও দুই কিশোর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে বলে পুলিশ জানায়। অপর আসামি সিয়ামের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতা ও পরিকল্পনায় যুক্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে অপ্রতিমের পরিবারের কাছে অভিযোগপত্রের বিস্তারিত এখনো স্পষ্ট নয়।
দুই কিশোরের বয়স নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলে আসছে পরিবার। প্রয়োজনে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের প্রকৃত বয়স নির্ধারণের দাবিও জানানো হয়েছিল; কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। অভিযোগপত্রের অনুলিপি হাতে পাওয়ার পর আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে পরিবার।
মামলার বাদী ও অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, তিন দিন আগে তিনি তদন্ত কর্মকর্তাকে ফোন করে অভিযোগপত্র দাখিলের সময় জানতে চেয়েছিলেন; তখন তাকে পূজার ছুটির পরপরই জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। রাত সাড়ে ১২টার দিকে তদন্ত কর্মকর্তা ফোনে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার কথা জানান। সন্তানকে ঘিরেই তাদের বাঁচার সব স্বপ্ন ছিল বলে জানিয়ে তিনি বলেন, তারা খুনিদের দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি দেখতে চান—এখন তাদের একটাই চাওয়া সেটাই।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৮ সেপ্টেম্বর। সেদিন কুমিল্লা নগরের কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। সে কোটবাড়ির বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে পরিকল্পিতভাবে নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় সে বাধা দিলে বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়; সেই আঘাতেই তার মৃত্যু হয়।
তদন্তে পুলিশ প্রথমে প্রধান অভিযুক্ত তুহিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। পরে তদন্তে সিয়ামের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়ে তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনটি তুহিনের বাসার খাটের তোশকের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। নিখোঁজের পর বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করেই তুহিনকে শনাক্ত করা হয় বলে জানায় পুলিশ।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান বলেন, পুলিশ সুপারের দেওয়া সময়সীমার মধ্যেই অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে; মরদেহ উদ্ধারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তার এবং গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শেষ করে ৩১ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে।
তবে শারদীয় দুর্গাপূজার সরকারি ছুটির কারণে অভিযোগপত্র দাখিলের পরপরই আদালতের পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হয়নি। পুলিশ সূত্র জানায়, ছুটি শেষে রোববার থেকে আদালতের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা। সেই কার্যক্রম শুরু হলেই শুরু হবে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচারিক যাত্রা, যার দিকে তাকিয়ে আছে শোকার্ত পরিবারটি।






