বিশ বছর ধরে উন্নয়নবৈষম্যের শিকার বগুড়া, বড় বরাদ্দের পরিকল্পনা জানালেন প্রতিমন্ত্রী
বিশ বছর ধরে বগুড়ার মানুষ উন্নয়নবৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বলেছেন, বর্তমান সরকারের বয়স মাত্র সাত মাস; উন্নয়ন দৃশ্যমান হতে কিছুটা সময় লাগবে। বগুড়াকে ঘিরে সরকারের বড় বড় উন্নয়ন পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার বগুড়ার মমইন কনভেনশন সেন্টারে ‘বগুড়ার উন্নয়ন সম্ভাবনা, সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ’ নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় জেলার উন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বগুড়া কৃষিতে উদ্বৃত্ত একটি জেলা। এখানে বছরে প্রায় তিন হাজার ৫০০ কোটি টাকার খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকে। অথচ সম্ভাবনাময় এই জেলাকে দীর্ঘদিন কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। বগুড়াকে শিল্প, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নগরায়ণের ক্ষেত্রে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত করতে সরকার কাজ করছে বলে জানান তিনি।
বগুড়ার উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে মীর শাহে আলম বলেন, আরাফাত রহমান কোকো প্যারা স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। বগুড়া বহুমাত্রিক বিমানবন্দর নির্মাণের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে ১০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে। এই রেলপথ উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর জন্য দীর্ঘদিনের দাবি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বগুড়া সিটি করপোরেশনের অবকাঠামো উন্নয়নে এক হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জেলার ১৩টি উপজেলার উন্নয়নে তিন হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং পৌরসভাগুলোর জন্য দুই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বগুড়া ওয়াসা ও বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বিভিন্ন উপজেলায় ডাকবাংলো নির্মাণ ও উন্নয়নে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং বিসিক শিল্প পার্কের কাজও শিগগির শুরু হবে।
সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নে বিভিন্ন মহাসড়ক চার থেকে ছয় লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে মীর শাহে আলম বলেন, যানজট নিরসন ও শহরের সৌন্দর্যবর্ধনে প্রাথমিকভাবে ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। যমুনার ভাঙন রোধ, পানি সংরক্ষণে ড্যাম্প স্টেশন নির্মাণ এবং স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণেও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জেলার ১৩টি উপজেলায় ১৫১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষা খাতের পরিকল্পনাও তুলে ধরেন তিনি। বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়কে বহুমাত্রিক উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। করতোয়া নদীর পাশ দিয়ে চার লেনের সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
জাতীয় উন্নয়ন বরাদ্দ নিয়ে মীর শাহে আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুরো দেশকে সমান চোখে দেখেন। রংপুর সিটি করপোরেশনের জন্য এক হাজার ৮০০ কোটি টাকা এবং গোপালগঞ্জ জেলার উন্নয়নে এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, উন্নয়ন কোনো নির্দিষ্ট এলাকার জন্য নয়; দেশের প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নই সরকারের লক্ষ্য।
শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়াকে সরকারের ইতিবাচক অর্জন হিসেবে তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এবার অতিরিক্ত এক হাজার ২০০টি পূজামণ্ডপ তৈরি হয়েছিল। তিনি বলেন, হিন্দুরা কারো পকেটের লোক নন, গত নির্বাচনে তারা তা প্রমাণ করেছেন; তারা স্বাধীনভাবে নিজেদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিএনপির নেতাকর্মীদের উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ উত্তরাঞ্চলের মানুষকে উন্নয়নের নামে ধোঁকা দিয়েছে। নেতাকর্মীদের শুধু গত ১৭ বছরের নির্যাতনের কথা না বলে গত ২০ বছরের নির্যাতন ও বঞ্চনার ইতিহাস তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় প্রধান বক্তা প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, উত্তরাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র বগুড়া দীর্ঘদিন বঞ্চিত থেকেছে; এই বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে বগুড়ার উন্নয়ন করতে হবে। বগুড়ার উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান। দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক লোটন একরামের সভাপতিত্বে সভায় সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা ও আব্দুল মুহিত তালুকদারসহ জেলার প্রশাসন ও বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন। এখন বগুড়াবাসীর নজর থাকবে ঘোষিত এই বড় পরিকল্পনাগুলো মাঠে কত দ্রুত দৃশ্যমান হয়, সেদিকে।






