সার্বিয়ায় দুই বছরের রাস্তার আন্দোলন এবার ভোটের লড়াইয়ে: জরিপে এগিয়ে শিক্ষার্থীদের তালিকা
সার্বিয়ায় টানা দুই বছর ধরে রাস্তায় প্রতিবাদ করে আসা শিক্ষার্থীরা এবার সরকার গঠনের দাবি নিয়ে ভোটের ময়দানে নেমেছে। রোববারের সংসদ নির্বাচনের আগে প্রকাশিত একটি জরিপে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন তালিকা ক্ষমতাসীন দলকে পেছনে ফেলেছে—এক দশকের বেশি সময়ে এই প্রথম কোনো বিরোধী তালিকা জাতীয় জরিপে এগিয়ে গেল।
২০১২ সাল থেকে প্রতিটি নির্বাচনে জিতে আসা আলেকসান্দার ভুচিচের শাসক সার্বিয়ান প্রোগ্রেসিভ পার্টির (এসএনএস) জন্য এই নির্বাচন তাই সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থীদের তালিকা এসএনএসকে হারিয়ে দেওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি করেছে বলেই বিশ্লেষকদের ধারণা।
স্বাধীন জরিপ প্রতিষ্ঠান নিউ সার্বিয়ান পলিটিক্যাল থটের মঙ্গলবার প্রকাশিত জরিপে দেখা গেছে, স্টুডেন্ট লিস্ট পেয়েছে ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ সমর্থন, আর ভুচিচের দলের পক্ষে রয়েছে ৪২ দশমিক ৭ শতাংশ। ব্যবধান সামান্য হলেও এর প্রতীকী তাৎপর্য অনেক বড়।
নোভি সাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ বছর বয়সী আইনের ছাত্র কস্তা গোলুবোভিচ বলেন, জেনারেশন জেড ও শিক্ষার্থীরা এমন সরকারের জন্য লড়ছে, যারা তাদের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ করবে, বরং প্রাপ্তবয়স্ক জীবন ঠিকমতো শুরু হওয়ার আগেই তা দুর্বল করে দেবে না।
আধুনিক সার্বিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এই প্রতিবাদ আন্দোলনের শুরু ২০২৪ সালের নভেম্বরে। নোভি সাদে সদ্য সংস্কার করা একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে পড়ে দুই শিশুসহ ১৬ জন নিহত হন।
নিহতদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বালন থেকে শুরু হওয়া সেই শোক দ্রুত বিশাল প্রতিবাদে রূপ নেয়। সরকারের পক্ষ থেকে দায় অস্বীকারের অভিযোগ আন্দোলনকে আরও উজ্জীবিত করে এবং আগের প্রধানমন্ত্রীকে পদ ছাড়তে বাধ্য করে। ২০২৫ সালের মার্চে বেলগ্রেডে তিন লাখ ২৫ হাজারের বেশি মানুষের সমাবেশ ছিল আন্দোলনের চূড়া। তখন থেকেই শিক্ষার্থীরা আগাম নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে।
তবে জরিপ নিয়ে সতর্ক করেছেন নিউ সার্বিয়ান পলিটিক্যাল থটের সম্পাদক জোর্জে ভুকাদিনোভিচ। তাঁর ভাষায়, প্রকাশিত সংখ্যা একটি মুহূর্তের চিত্র, ভবিষ্যদ্বাণী নয়। আগের ফলাফল নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ‘প্রায় উন্মত্ত’ আক্রমণের কারণে তিনি এবারের ফল প্রকাশ না করার কথাও ভেবেছিলেন।
নির্বাচনী প্রচারজুড়ে সরকারপন্থী ট্যাবলয়েড ও ক্ষমতাসীন দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা স্বাধীন জরিপকারীদের ‘ভুয়া গবেষক’ বলে আক্রমণ করে আসছেন।
অন্যদিকে স্টুডেন্ট লিস্টের সমর্থকেরা বলছেন, জরিপের এই চিত্র কয়েক মাস ধরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারের ফল। গোলুবোভিচের ভাষায়, তারা হাল ছাড়েনি এবং এসএনএসের দুর্গ বলে বিবেচিত এলাকাগুলোতেও পৌঁছেছে—অথচ আগে শুধু ক্ষমতাসীন দলেরই সারা দেশে প্রচার চালানোর সক্ষমতা ছিল।
প্রেসিডেন্ট পদ ছেড়ে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নামা ভুচিচ নিজেও সড়কপথে প্রচারে নেমেছেন। কখনো কালো স্কোডা গাড়ি নিজে চালিয়ে লোকগান গাইতে গাইতে সমাবেশে যাওয়ার ভিডিও তিনি নিজের টিকটক অ্যাকাউন্টে দিয়েছেন, যেখানে তিনি সরাসরি প্রশ্নোত্তর পর্বও করেন।
তাঁর চটকদার বিজ্ঞাপনও আলোচনায় এসেছে। এক বিজ্ঞাপনে তিনি রেস্তোরাঁর ওয়েটার সেজে একটি সার্ব পরিবারের অর্ডার নিচ্ছেন—দাদা চাইছেন রাশিয়ার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নয়, বাকিরা চাইছেন নতুন মহাসড়ক, বেশি বেতন ও ভালো পেনশন। আরেকটিতে তিনি বসে আছেন একটি খালি চেয়ারের মুখোমুখি, যার ওপর স্টুডেন্ট লিস্টের প্রধান প্রার্থী ইলিয়া সারদানোভিচের ছবি আর বাঁধাকপি আচার বানানোর পাথর—জনপ্রিয় ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টা হিসেবেই এগুলো দেখা হচ্ছে।
ভুচিচের প্রোগ্রেসিভ পার্টি ১৪ বছর ধরে পশ্চিমের জন্য অস্বস্তিকর কিন্তু অপরিহার্য অংশীদার। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রার্থী দেশ হয়েও সার্বিয়া রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে অস্বীকার করেছে; গত বছর ভুচিচ মস্কোতে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজেও গিয়েছিলেন। পূর্বানুমেয় বেলগ্রেডকেই পছন্দ করে ইউরোপীয় নেতারা বেশির ভাগ সময় চোখ সরিয়ে রেখেছেন, আন্দোলন বাড়লেও তাঁরা কিছু বলতে লক্ষণীয়ভাবে দেরি করেছেন।
ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্স সেন্টারের ইগর নোভাকোভিচের মতে, অতীতে মিডিয়া ও প্রতিষ্ঠানের ওপর ভুচিচের নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকায় বিরোধীরা টেকসই চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারেনি। কিন্তু শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ‘অত্যন্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিকতাহীন’ এবং আইনের শাসনের মতো ব্যাপক আবেদনের ইস্যুতে একক মঞ্চ তৈরি করতে পেরেছে—যেসব ইস্যু আগে ভোটারদের বিভক্ত করত, সেগুলো তারা এড়িয়ে গেছে।
‘শিক্ষার্থীরা দেশ চালাতে পারবে না’—সরকারের এই আক্রমণের জবাবে আন্দোলনকারীরা বেছে বেছে প্রার্থী তালিকা তৈরি করেছে, যেখানে আছেন চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও অধ্যাপক—রাজনীতির বাইরে পেশায় সফল মানুষেরা। গোলুবোভিচ বলেন, অনেকেই খুশি হন এটা শুনে যে প্রার্থী রাজনীতিক নন, একজন চিকিৎসক; ৩০ বছর ধরে মাইক্রোফোনে কথা বলাই যাঁর মূল দক্ষতা, তাঁর চেয়ে একজন বিশেষজ্ঞ বেশি সাহায্য করবেন—এই ধারণা বিক্রি করা কঠিন নয়।
শিক্ষার্থীরা শক্তিশালী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-যন্ত্রও গড়ে তুলেছে; তাদের নিজেদের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৯০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্মিলিত অনুসারী চার কোটির বেশি। ক্ষমতাসীন দলের টিকটক বা এক্স পোস্টে প্রথম সারির মন্তব্যগুলোতে শত শত লাইকসহ বারবার উঠে আসছে তাদের স্লোগান—‘স্তুদেন্তি পোবেজুজু!’ অর্থাৎ শিক্ষার্থীরাই জিতবে।
নোভাকোভিচ সতর্ক করেছেন, জিতলেও স্টুডেন্ট লিস্টকে মুখোমুখি হতে হবে গভীরভাবে গেড়ে বসা একটি ব্যবস্থা ও আমলাতন্ত্রের; রূপান্তর সহজ হবে না। আর ভুচিচ জিতলেও চ্যালেঞ্জ থাকবে—এসএনএস ও সরকার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, সরাসরি না হারলেও তাদের বৈধতা ও কর্তৃত্ব দুর্বল হওয়ার একটি সময় পার করতে হবে।





