নজরদারি আর স্থায়ী শঙ্কার মধ্যে মস্কোতে পশ্চিমা কূটনীতিকদের দিনযাপন
‘রাশিয়ায় রাষ্ট্রদূত হওয়া সম্ভবত আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব ছিল,’—২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মস্কোতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করা লিন ট্রেসি বলেছেন এ কথা। ইউক্রেনে রাশিয়ার সর্বাত্মক আগ্রাসন শুরুর পর থেকে মস্কোতে কর্মরত পাঁচজন পশ্চিমা কূটনীতিকের সঙ্গে কথা বলে যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে যুদ্ধকালীন রাশিয়ায় তাদের জীবন শীতল যুদ্ধের যুগের সঙ্গে তুলনীয় হয়ে উঠেছে।
একসময় শীতল যুদ্ধের সবচেয়ে খারাপ মুহূর্তগুলোতেও উত্তেজনা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের কূটনীতিকেরা। এখন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সরকারের চোখে ‘অবন্ধুসুলভ’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে তারা সার্বক্ষণিক নজরদারির মধ্যে, বিচ্ছিন্ন অবস্থায় এবং যে দেশকে বোঝার জন্য তাদের পাঠানো হয়েছিল, সেই দেশের সঙ্গেই ক্রমশ যোগাযোগহীন হয়ে পড়ছেন; ইউক্রেনের যুদ্ধ পঞ্চম বছরে গড়িয়েছে।
কূটনীতিকদের তুলনা অনুযায়ী, এখনকার চাপের মাত্রা শীতল যুদ্ধের যুগের মতো—যখন পশ্চিমা দূতাবাসগুলোকে শারীরিক নজরদারি, উপহারের ভেতরে লুকানো শ্রবণযন্ত্র এবং কর্মকর্তাদের গতিবিধি অনুসরণে ব্যবহৃত প্রায় অদৃশ্য রাসায়নিক ‘স্পাই ডাস্ট’ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হতো। ১৯৪৫ সালে রাশিয়ায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে উপহার দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের গ্রেট সিলের কাঠের প্রতিলিপির ভেতরেও পরে একটি শ্রবণযন্ত্র পাওয়া গিয়েছিল।
২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর পর ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন দেশ থেকে শত শত রাশিয়ান কূটনীতিককে বহিষ্কার করা হয়। জবাবে মস্কোও শত শত পশ্চিমা কূটনীতিককে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে, ফলে অনেক দূতাবাস জনবল সংকটে পড়ে। সাবেক ফরাসি রাষ্ট্রদূত পিয়ের লেভি ও লিন ট্রেসি—দুজনেই মস্কোতে দায়িত্ব পালনকারীদের মধ্যে রয়েছেন যারা এই অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন।
ট্রেসির ৩০ বছরের ক্যারিয়ারে পাকিস্তানের মতো দেশও ছিল, যেখানে ২০০৮ সালে তিনি এক সশস্ত্র হামলা থেকে বেঁচে যান। তবু তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সার্বক্ষণিক শারীরিক হুমকির মধ্যেও পেশোয়ারের দায়িত্ব এক অর্থে রাশিয়ার চেয়ে সহজ ছিল, কারণ সেখানে তাঁর নিজের নিয়ন্ত্রণে কিছু বিষয় ছিল। মস্কোকে কঠিন করে তুলেছিল উচ্চমাত্রার অনিশ্চয়তা, যার প্রধান উৎস ছিল রুশ পাল্টা-গোয়েন্দা তৎপরতার স্থায়ী চাপ।
‘শ্রবণযন্ত্র থাকবে ধরে নিন, ধরে নিন আপনার বাড়ির প্রতিটি ঘরে ক্যামেরা আছে,’—মস্কো যাওয়ার আগে পাওয়া সতর্কবার্তার কথা এভাবেই বলেছেন এক সাবেক ইউরোপীয় কূটনীতিক। আরেক সাবেক রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা এফএসবি তাঁর দূতাবাসের দুজন রুশ কর্মীকে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগের চেষ্টা করলে তাঁদের চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়; ওই দুজন দূতাবাসকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন, নইলে তাঁরা ফৌজদারি মামলার মুখে পড়তে পারতেন।
শুধু দূতাবাসের কর্মীরাই নন, শিক্ষা ও সংস্কৃতি জগতের যেসব রুশ নাগরিক সাধারণত কূটনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তেন, তাঁদেরও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ এড়াতে ভয় দেখানো হচ্ছে। এক সাবেক রাষ্ট্রদূত বলেছেন, তাঁর অতিথিদের একবার এফএসবি এজেন্টরা দূতাবাসের দরজা পর্যন্ত অনুসরণ করেছিল। গত জুনে মস্কোতে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে রাজার জন্মদিনের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিরা ক্রেমলিনপন্থী কর্মী ও রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের হয়রানির শিকার হন এবং পরে পুলিশ তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করে; এক অতিথি জানিয়েছেন, ভয়ের কারণে এরপর তিনি পশ্চিমা দূতাবাসগুলোর বেশ কয়েকটি আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দিয়েছেন।
এক সাবেক রাষ্ট্রদূতের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ‘স্থায়ী শঙ্কা’ অনেক কর্মকর্তাকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করেছে। রাশিয়া ছাড়ার পরও তিনি নিজে কাঁধের ওপর দিয়ে পেছনে তাকাতেন বলে জানিয়েছেন। পশ্চিমে থাকা রুশ কূটনীতিকেরাও একই ধরনের অন্যায্য আচরণের অভিযোগ করেন, তবে মস্কোতে দায়িত্ব পালন করা কূটনীতিকদের মতে, রুশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তৎপরতার পরিধি ও কৌশল অনেক বেশি বিস্তৃত।
আগ্রাসনের পরপরই ইউরোপজুড়ে আলোচনা হয়েছিল—রাষ্ট্রদূতদের ফিরিয়ে আনা হবে, নাকি রাশিয়ায় কাজ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে। পিয়ের লেভি স্মরণ করেছেন, তিনি সঙ্গে সঙ্গে প্যারিসে ফোন করে বলেছিলেন, দূতদের ফিরিয়ে আনা ভুল হবে; তাঁর অনুভূতি ছিল, সম্পর্ক যত খারাপ হবে, দূতদের ভূমিকা ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আরেক সাবেক ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতের ভাষ্য অনুযায়ী, আগ্রাসন তাঁদের কাজ দ্রুত বদলে দেয়—দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য ও যৌথ প্রকল্পে যে সহযোগিতা দরকার হতো, তা আর সম্ভব ছিল না।
যারা রাশিয়ায় থেকে গেলেন, তাঁদের সামনে নিজ দেশের নাগরিক ও কোম্পানিগুলোকে সহায়তার বাইরেও নতুন অগ্রাধিকার হাজির হয়। প্রথমত, মস্কোর চোখে অবন্ধু দেশগুলোও দেশের ভেতরে আসলে কী ঘটছে, তার সঠিক চিত্র পেতে রুশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে অন্তত কিছু যোগাযোগের চ্যানেল রাখতে চাইত। পাশাপাশি কর্মীদের সুরক্ষা ও দূতাবাসগুলো সচল রাখাও ছিল বড় কাজ।
দৈনন্দিন সংকটগুলোও ছিল বিচিত্র। ২০২১ সালে বিদেশি নাগরিক নিয়োগে রাশিয়ার নিষেধাজ্ঞার পর মার্কিন দূতাবাসের রক্ষণাবেক্ষণ দল মারাত্মক জনবল সংকটে পড়ে; পানির পাইপ ফেটে যাওয়ার মতো ছোট সমস্যাও বড় বিপত্তি হয়ে দাঁড়াত। এক কূটনীতিক রুশ এক কর্মকর্তাকে জনবল সংকটের কথা বললে তিনি জবাব দিয়েছিলেন, ‘অন্তত আপনাদের রাঁধুনিটা তো এখনো আছে।’ ইউক্রেনের পক্ষে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পর রুশ ব্যাংকগুলো সুইফট পেমেন্ট নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হলে এবং মাস্টারকার্ড ও ভিসা রাশিয়ায় কার্যক্রম স্থগিত করলে অনেক দূতাবাস দৈনন্দিন খরচ চালাতেও হিমশিম খায়। এক সাবেক রাষ্ট্রদূত স্মরণ করেছেন, একসময় তাঁর হাতে নগদ টাকা ফুরিয়ে যায় এবং তিনি কর্মীদের বেতন দিতে পারছিলেন না—শেষে বহিষ্কৃত হয়ে গাড়ি বিক্রি করা আরেক কূটনীতিক স্যুটকেসে করে রুবল এনে দিলে সেই সংকট কাটে।
রুশ কর্মকর্তারা পশ্চিমা কূটনীতিকদের প্রতি নিজেদের মনোভাব গোপনও করেন না; ‘অবন্ধু দেশগুলোর’ কূটনীতিকদের প্রকাশ্যেই গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন তারা। ক্রেমলিনের বিরুদ্ধে ভিন্নমতের প্রকাশে আগ্রহ দেখানো কূটনীতিকদের প্রতি মস্কো বিশেষভাবে সমালোচনামুখর। রুশ সাংবাদিক আলেক্সেই ভেনেদিকতভের ভাষ্য অনুযায়ী, বেশির ভাগ রুশ কর্মকর্তার পশ্চিমা দূতাবাসগুলোর সঙ্গে কথা বলা কার্যত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ভেনেদিকতভ বলেছেন, তিনি রুশ কর্মকর্তাদের বলতেন—রাষ্ট্রদূতেরা নিজেদের কাজ করতে পারছেন না বলেই তাদের ভুল বোঝা হচ্ছে, আর এর জন্য দায়ী তাদের নিজেদের আচরণই।
এক সাবেক ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতের ভাষ্য অনুযায়ী, আজ অনেক পশ্চিমা সরকারের সঙ্গে মস্কোর যোগাযোগ প্রায় নেই—‘কোনো ফোনকল নেই, মন্ত্রী পর্যায়ে কোনো বৈঠক নেই।’ তবু তাঁদের মতে, এতে কূটনীতিকদের গুরুত্ব আরও বেড়েছে, কারণ নিজ নিজ সরকারের অবস্থান মস্কোর কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব এখন তাঁদের কাঁধেই। এক কূটনীতিকের ভাষায়, যুদ্ধের সময় সেনাপতিরা যেমন নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেন, কূটনীতিকদের ক্ষেত্রেও তাই—পরিস্থিতি সত্যিই কঠিন হলে প্রতিটি পদক্ষেপই অর্থবহ হয়ে ওঠে।
২০২৫ সালে মস্কো ছাড়ার সময় লিন ট্রেসির অনুভূতি ছিল, তিনি তাঁর প্রধান লক্ষ্য পূরণ করেছেন—মার্কিন দূতাবাস দৃঢ়ভাবে টিকে ছিল। পাশাপাশি আমেরিকান ও সাধারণ রুশদের মধ্যে সংযোগ ধরে রাখতে তিনি ও তাঁর দল যে কাজ করেছেন, তা নিয়েও তিনি গর্বিত। তাঁর কথায়, কোনো এক সময় সরকারে সরকারে সম্পর্কের উন্নতির সুযোগ আসবেই—তখন মানুষে মানুষে এই বন্ধনগুলোই সেই উন্নতিকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করবে।






