সীতাকুণ্ডে প্রকাশ্যে কাটা হচ্ছে শতাধিক গাছ, টিলা সমতল: রেলওয়ে বলছে ‘তথ্য নেই’, বন বিভাগ দেখেও নীরব
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটে রেলওয়ে ও সরকারি খাসজমিতে থাকা বনের গাছ প্রকাশ্যে কাটা হচ্ছে। প্রায় ২০ দিন ধরে শতাধিক গাছ কাটা হলেও রেলওয়ে বিভাগের দাবি, তাদের কাছে এমন কোনো তথ্য নেই। এদিকে বন বিভাগের কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন, তবে এরপরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কনটেইনার ডিপো তৈরির লক্ষ্যে একটি চক্র প্রকাশ্যে নির্বিচারে গাছ ও টিলা কেটে জমি সমতল করছে। রেলওয়ে ও সরকারি খাসজমির যেখান থেকে বন উজাড় করা হচ্ছে, সেটি সীতাকুণ্ড মহাসড়ক থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে।
এলাকাটি সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট জলিল রেলস্টেশনের উত্তর-পূর্ব পাশে এবং পোর্ট লিংক-২ কনটেইনার ডিপোর দক্ষিণ পাশে অবস্থিত; স্থানীয়ভাবে এটি জঙ্গল ভাটিয়ারি নামে পরিচিত।
অভিযোগ রয়েছে, গাছ কাটা শুরুর আগে বনায়ন এলাকায় বসবাসকারী ভূমিহীন মানুষদের রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের নাম ভাঙিয়ে উচ্ছেদের হুমকি দিচ্ছে চক্রটি। তবে কারা এই কাজ করছে, ভয়ে তাদের বিষয়ে মুখ খুলছেন না স্থানীয়রা।
এর আগে বনায়নের এই এলাকা স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠানকে লিজ দেওয়ার চেষ্টা করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রেলওয়ের সম্পত্তি বাণিজ্যিকভাবে ইজারা দেওয়া বন্ধ থাকা সত্ত্বেও এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
এরপর ওই এলাকায় বসবাসকারী ভূমিহীনদের উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হয় গত সেপ্টেম্বরে। স্থানীয়দের বাধার মুখে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের উচ্ছেদ অভিযান সে সময় স্থগিত করা হয়। এরপর বাসিন্দাদের স্থাপনা সরিয়ে নিতে এক মাস সময় দেওয়া হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রেলওয়ের জমিতে তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিন শতাধিক পরিবার বসবাস করছে। বিকল্প পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে উচ্ছেদ অভিযান চালাতে আসায় পরিবার-পরিজন নিয়ে রাস্তায় নেমে অবস্থান কর্মসূচি ও প্রতিবাদ করেন তাঁরা। মূলত এরপরই বন উজাড় শুরু হয় বলে স্থানীয়দের ধারণা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সেখানে গত প্রায় ২০ দিন ধরে গাছ কাটা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ছোট-বড় শতাধিক গাছ কাটা হয়েছে। কেটে নেওয়া গাছগুলো টুকরো টুকরো করে সাতটি ট্রাকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কাটা গাছগুলোর কিছুর বয়স ৪০ থেকে ৫০ বছর।
যেখানে গাছ কাটা হচ্ছে, তার কাছেই রয়েছে বন বিভাগের ফৌজদারহাট চেকপোস্ট। চেকপোস্টের দায়িত্বে থাকা বন কর্মকর্তা মো. সাজ্জাত হোসেন বলেন, রেলওয়ের সরকারি গাছ কাটার তথ্য পেয়ে এক সপ্তাহ আগে তিনি সরেজমিন ঘটনাস্থলে যান। সেখানে গিয়ে কাটা গাছের স্তূপ দেখতে পান, কিছু গাছ সরিয়ে ফেলার কথাও শুনেছেন। তিনি বলেন, জায়গাটি রেলওয়ের, গাছগুলোও রেলের; তবে যথাযথ টেন্ডার প্রক্রিয়ায় গাছগুলো কোনো পক্ষকে দেওয়া হয়েছে কি না, তা তিনি নিশ্চিত নন।
সরেজমিন ওই এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ এলাকায় বনায়নের গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। সাত-আটজন শ্রমিক গাছের গুঁড়ি ও ডালপালা টুকরো করছেন। কিছু উঁচু টিলা কেটে সমতল করার চিহ্নও সেখানে দেখা গেছে।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, সরকারি খাসজমি ও রেলওয়ের এই জায়গা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে কনটেইনার ডিপো তৈরির কাজ করছে একটি চক্র। গাছ কাটায় জড়িত রহমান মনির নামের এক ব্যক্তি বলেন, গাছগুলো রেলওয়ে ও সরকারি বনায়নের। তাঁর দাবি, এক ব্যক্তি রেলওয়ে থেকে টেন্ডারে গাছগুলো কিনে তাঁদের কাটার দায়িত্ব দিয়েছেন। অনেক গাছ কেটেছেন বলে স্বীকার করলেও কে তাঁদের নিয়োজিত করেছেন, তা জানাতে চাননি তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা মো. খোরশেদ আলম চৌধুরী বলেন, সেখানে গাছ কাটার কোনো তথ্য তাঁর কাছে নেই; গাছ কাটার কোনো টেন্ডারও দেওয়া হয়নি। এই কথোপকথনের পর তিনি সাংবাদিকদের কাছে গাছ কাটার ছবি ও ভিডিও পাঠাতে বলেন। পরে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে ছবি ও ভিডিও পাঠানো হলেও এরপর তিনি আর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি।
ফলে প্রশ্ন রয়ে গেছে — টেন্ডার ছাড়া শতাধিক সরকারি গাছ কাটল কারা, আর ২০ দিন ধরে প্রকাশ্যে এই কাজ চললেও দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই বিভাগ কেন কার্যকর ব্যবস্থা নিল না। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত তদন্ত করে গাছ কাটা বন্ধ ও জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।





