বৈশ্বিক ঋণ ছাড়াল ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার, শুধু সুদেই খরচ ৩.৩ ট্রিলিয়ন—সামরিক ব্যয়ের চেয়েও বেশি
বিশ্বজুড়ে সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত ঋণের পরিমাণ নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) তথ্যমতে, চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই বৈশ্বিক ঋণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়ে মোট ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে—যা পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের বিপরীতে গড়ে প্রায় ৪৪ হাজার ডলারের সমান।
আইআইএফের তথ্য অনুযায়ী, মূলত উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে ঋণ বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি। ঋণের এই উল্লম্ফন শুধু সংখ্যার খেলা নয়; এর সরাসরি মূল্য দিতে হচ্ছে সুদ পরিশোধের মাধ্যমে, যার অঙ্ক এখন বিশ্ব অর্থনীতির অনেক বড় খাতের মোট ব্যয়কেও ছাড়িয়ে গেছে।
এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত এক বছরে শুধু উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোকেই সরকারি বন্ডের সুদ পরিশোধে ব্যয় করতে হয়েছে ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। সুদের এই বিপুল অঙ্কটি বিশ্বজুড়ে সামরিক খাতে হওয়া মোট ব্যয় (৩.১ ট্রিলিয়ন ডলার), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের বিনিয়োগ (২.৬ ট্রিলিয়ন ডলার) এবং পরিবেশবান্ধব পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতের বিনিয়োগের (২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার) চেয়েও বেশি।
ক্রমবর্ধমান ঋণের সুদ পরিশোধের এই অতিরিক্ত চাপ সরাসরি ইউরোপের জনজীবনে অভিঘাত তৈরি করেছে। জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়, নিম্ন মজুরি, আবাসন সংকট ও শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দের ঘাটতির প্রতিবাদে সম্প্রতি ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে বিক্ষোভ করেছেন।
ফ্রান্সে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবেই একদিনে সাড়ে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। দেশটিতে ২০০২ সালের পর থেকে ঋণ নেওয়ার খরচ বা ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদের হার সর্বোচ্চ প্রায় ৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে, যা জার্মানির ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ সুদের চেয়ে অনেক বেশি। এমনকি অতীতে বড় সংকটে পড়া ইতালি ও গ্রিসের চেয়েও বর্তমানে ফ্রান্সের ঋণের খরচ বেশি, আর ইউরোপে কেবল যুক্তরাজ্যের ঋণের খরচ এর চেয়ে ওপরে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ ফ্রান্সের সরকারি ঋণ দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১২১ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা বর্তমানে ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার বা জিডিপির ১১৮ দশমিক ৫ শতাংশ।
সরকারি ঋণের আর্থিক মূল্যের হিসাবে বর্তমানে বিশ্বে এককভাবে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যার ঋণের পরিমাণ ৪১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার বা জিডিপির ১২৭ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা চীনের ঋণ ২২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার (জিডিপির ১০৪ শতাংশ)।
অন্যদিকে জাপানের মোট ঋণ ৮ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার হলেও অর্থনীতির আকারের তুলনায় দেশটির ঋণের বোঝা বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ—জিডিপির ১৯৯ শতাংশ। অন্যান্য প্রধান দেশের মধ্যে যুক্তরাজ্যের সরকারি ঋণ ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার (জিডিপির ১০২ শতাংশ), ইতালির ঋণ ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার (জিডিপির ১৩৮ শতাংশ) এবং জার্মানির ঋণ ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার (জিডিপির ৬৫ শতাংশ)।
সরকারগুলো সাধারণত রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে নির্দিষ্ট মেয়াদের বন্ড ইস্যু করে অর্থ সংগ্রহ করে। তবে বন্ডের বাজারমূল্য কমলে ও ইল্ড বা প্রত্যাশিত মুনাফার হার বাড়লে সরকারকে অতিরিক্ত সুদ গুনতে হয়, যা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর বড় ধরনের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
রাষ্ট্রীয় আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কেবল পুরোনো ঋণের সুদ পরিশোধে আটকে যাওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, পেনশন ও অবকাঠামোর মতো জনকল্যাণমূলক খাতে বরাদ্দ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হচ্ছে। এই আর্থিক ঘাটতি পূরণ করতে সরকারগুলোকে বাধ্য হয়ে করের বোঝা বাড়াতে হচ্ছে কিংবা নতুন ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
একই সঙ্গে সরকারি বন্ডের ইল্ড বেড়ে যাওয়ার প্রভাব বেসরকারি ব্যাংক খাতেও পড়ে, যার ফলে সাধারণ মানুষের জন্য বাড়ি তৈরির ঋণ, গাড়ি কেনা কিংবা ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার বেড়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের ঋণের চাপ শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে সাধারণ পরিবারের মাসিক বাজেটে।
বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, ঋণ কোনো দেশের অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় হাতিয়ার হলেও দীর্ঘমেয়াদে সুদের এমন চড়া বোঝা রাষ্ট্রগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও সার্বভৌম নীতি নির্ধারণের স্বাধীনতাকে সীমিত করে তুলছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে আরও গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হলো, ঋণের এই চক্র থেকে বেরোনোর পথ সরকারগুলো কীভাবে খুঁজবে—কর বাড়িয়ে, ব্যয় কমিয়ে, নাকি প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে। ইউরোপের রাজপথের বিক্ষোভই বলে দিচ্ছে, যেকোনো পথেই সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।




