বিশ্ববাজারে সোনা-রুপার দামে বড় পতন, আউন্সপ্রতি সোনা নামল ৪ হাজার ১০০ ডলারের নিচে
বিশ্ববাজারে স্বর্ণ ও রুপার দামে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মুদ্রাস্ফীতি ও সুদের হার দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে বজায় থাকার আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ১০০ ডলারের নিচে নেমে গেছে।
তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, স্পট মার্কেটে জিএমটি সময় সকাল ৮টা (বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টা) পর্যন্ত প্রতি আউন্স স্বর্ণ ৪ হাজার ৮৮ দশমিক ৯৫ ডলারে লেনদেন হয়েছে, যা আগের দিনের তুলনায় ৫২ দশমিক ১৫ ডলার বা ১ দশমিক ২৬ শতাংশ কম।
একই দিনে রুপার দামও বড় ধাক্কা খেয়েছে। প্রতি আউন্স রুপার দাম ২ দশমিক ৭ ডলার বা ৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৫৫ দশমিক ৮৯ ডলারে। এর ফলে আগের দিনের লেনদেনে অর্জিত মুনাফা ধরে রাখতে পারেনি এই দুই মূল্যবান ধাতু।
দরপতনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বেড়ে যাওয়া ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা। বুধবার (২১ অক্টোবর) সৌদি আরামকোর শায়বাহ তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলায় দুজন নিহত হওয়ার পর তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবে অবস্থিত তাদের কূটনৈতিক মিশনের কিছু কর্মী ও পরিবারের সদস্যদের দেশত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে, যা বাজারে অনিশ্চয়তার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি বিশ্ববাজারে স্থায়ী মুদ্রাস্ফীতির শঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মুদ্রানীতি শিথিল করার পরিকল্পনাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) সুদের হার অপরিবর্তিত রাখবে।
তবে জ্বালানিজনিত মুদ্রাস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকায় চলতি বছরের ডিসেম্বরে সুদের হার আরও বাড়তে পারে — এমন শঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বাজারসংশ্লিষ্টরা। সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনাই মূল্যবান ধাতুর বাজারে চাপ তৈরি করেছে।
যদিও স্বর্ণ ঐতিহ্যগতভাবে মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচিত হয়, কিন্তু উচ্চ সুদের হার এমন সম্পদের ধারণ খরচ বাড়িয়ে দেয় যেগুলো কোনো সুদের আয় দেয় না; ফলে স্বর্ণের আকর্ষণ কিছুটা কমে যায় — বিশ্লেষকদের এই ব্যাখ্যাই এবারকার পতনের পেছনে কাজ করেছে।
এদিকে মার্কিন ফেডের পাশাপাশি ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক এবং ব্যাংক অব জাপানও আগামী সপ্তাহে তাদের বর্তমান সুদের হার অপরিবর্তিত রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিন বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত একই সপ্তাহে আসায় বাজারের নজর এখন সেদিকেই।
সর্বশেষ এই দরপতনের ফলে গত এক মাসের ব্যবধানে স্বর্ণের বাজারদর কমেছে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ এবং রুপার বাজারদর কমেছে ১৩ দশমিক ১১ শতাংশ। রুপার পতনের হার স্বর্ণের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি হওয়ায় ছোট বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এই ধাতুটি নিয়ে উদ্বেগও বেশি।
বিশ্ববাজারের এই পতনের প্রভাব দেশের বাজারেও পড়ার সম্ভাবনা থাকে, কারণ বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করেই নির্ধারণ করা হয়। তবে দেশীয় বাজারে নতুন দাম ঘোষণা হবে কি না, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্টদের সিদ্ধান্তের ওপর।
আগামী সপ্তাহে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদের হার নিয়ে সিদ্ধান্ত এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির গতিপথই ঠিক করে দেবে স্বর্ণ ও রুপার দাম এই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠে, নাকি পতনের ধারা আরও দীর্ঘ হয়।




