অক্টোবরের প্রথমার্ধে পুঁজিবাজারে বিদেশি লেনদেনে বড় ধস, কমেছে প্রায় ৩৮ শতাংশ
দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেনে আবার বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। চলতি অক্টোবরের প্রথমার্ধে প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ২১৪ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন করেছেন, যা গত সেপ্টেম্বরের শেষার্ধে ছিল ৩৪৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক পাক্ষিকের ব্যবধানে বিদেশিদের লেনদেন কমেছে প্রায় ৩৮ শতাংশ।
ডিএসইর পাক্ষিক প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেনে এখনো কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা ফেরেনি। গত এক বছর ধরেই তাদের কার্যক্রমে বড় ধরনের ওঠানামা অব্যাহত রয়েছে বলে প্রতিবেদনের তথ্যে উঠে এসেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ১৩ মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মোট ৪ হাজার ৭০৭ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন করেছেন। এই দীর্ঘ সময়ের হিসাবেই বোঝা যায়, বাজারে বিদেশিদের উপস্থিতি থাকলেও তা কখনোই একটানা ঊর্ধ্বমুখী ধারায় থাকেনি।
মাসভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বিদেশিদের লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩৭৭ কোটি টাকা, যা ফেব্রুয়ারিতে বেড়ে সর্বোচ্চ ৬৬৩ কোটি টাকায় উঠেছিল। তবে মার্চে তা কমে ২৭২ কোটি এবং এপ্রিলে ১৭৫ কোটি টাকায় নেমে আসে।
এরপর মে মাসে বড় ধসের মুখে পড়ে বিদেশিদের লেনদেন, যা দাঁড়ায় মাত্র ৭৪ কোটি টাকায় — চলতি বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। পরবর্তীতে জুনে লেনদেন কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে ৫৪০ কোটি, জুলাইয়ে ৫২৩ কোটি, আগস্টে ৩১৯ কোটি এবং সেপ্টেম্বরে ৫৮১ কোটি টাকায় পৌঁছায়।
এর আগের বছর, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়েও বড় ধরনের পতন দেখা গিয়েছিল, যেখানে ডিসেম্বরে বিদেশিদের লেনদেন নেমেছিল ১৪৬ কোটি টাকায়। সব মিলিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট লেনদেন দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা, যা পূর্ববর্তী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৩ হাজার ৯৩১ কোটি টাকার তুলনায় কিছুটা বেশি।
শুধু মাসিক লেনদেনেই নয়, দেশের পুঁজিবাজার ও বন্ডবাজারে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগের নিট অবস্থানেও দীর্ঘমেয়াদি সংকট বজায় রয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছর থেকেই দেশীয় ঋণ সিকিউরিটিজ ও শেয়ারবাজারে নিট প্রবাহ ঋণাত্মক ধারায় চলে যায়; ওই অর্থবছরে নিট পোর্টফোলিও বহিঃপ্রবাহ ছিল ২ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা।
ধারাবাহিকভাবে ২০২১-২২ অর্থবছরে এই বহিঃপ্রবাহ দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬০ কোটি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ হাজার ৬৪০ কোটি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৮২০ কোটি টাকায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বহিঃপ্রবাহ কিছুটা কমে ১ হাজার ৬৮০ কোটি টাকায় নেমে এলেও সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আবার বেড়ে ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফলে নিট বিদেশি বিনিয়োগের চিত্র এখনো বহিঃপ্রবাহের দিকেই ঝুঁকে রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি তথ্যে দেখা যায়, ডিএসইর সামগ্রিক লেনদেনে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতির হার আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে সংকুচিত হয়েছে। ২০১৬ সালে ডিএসইর মোট লেনদেনে বিদেশিদের অংশ ছিল ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং ২০১৭ সালে টাকার অঙ্কে তা বেড়ে রেকর্ড ১১ হাজার ৪৪৮ কোটি টাকায় পৌঁছায়।
তবে ২০২০ সালের কোভিড মহামারির পর থেকেই এই অংশগ্রহণে বড় ধাক্কা লাগে। ২০২১ সালে বিদেশিদের অংশ নেমে আসে ১ দশমিক ১০ শতাংশে; পরবর্তী সময়ে ২০২২ ও ২০২৩ সালে তা আরও তলানিতে নেমে যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ ও শূন্য দশমিক ৭৭ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০২৪ সালে সামান্য বেড়ে তা ১ দশমিক ২২ শতাংশ বা ৩ হাজার ৯২৯ কোটি টাকায় ঠেকে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, পুঁজিবাজারের সামগ্রিক পরিবেশ, শেয়ারদরের নেতিবাচক প্রবণতা, ডলার সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অনিশ্চয়তা এবং মুনাফা প্রত্যাহারের জটিলতার কারণেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি এখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারছে না।
অক্টোবরের প্রথমার্ধের এই পতন সেই দীর্ঘমেয়াদি চিত্রেরই ধারাবাহিকতা। এখন দেখার বিষয়, মাসের দ্বিতীয়ার্ধে বিদেশি লেনদেন ঘুরে দাঁড়ায় কি না এবং বাজারে তাদের আস্থা ফেরাতে নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে কোনো নতুন উদ্যোগ আসে কি না।





