ফুটপাতের পিঠা-পুরির দোকানও আসছে নিবন্ধনের আওতায়, অথচ জানেনই না অনেক বিক্রেতা
রাজধানীর লালবাগের একটি গলিতে ছোট্ট দোকানে পিঠা আর নাশতার সামগ্রী বিক্রি করেন সোহেল। প্রতিদিন সকালে দোকান খুলে বিকেল পর্যন্ত খাবার বিক্রি করেন তিনি; সেই দোকানের আয় দিয়েই চলে তাঁর সংসার। অথচ খাবারের দোকানের জন্য বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) নিবন্ধন বা লাইসেন্স নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে কি না, তা তিনি জানেনই না।
একই অবস্থা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার খাবার বিক্রেতা আনোয়ারের। ফুটপাতে খাবার বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি; নতুন কোনো নিয়মের আওতায় তাঁর দোকান পড়বে কি না, সে বিষয়ে তাঁর কোনো ধারণা নেই। আজিমপুরের খাবার বিক্রেতা রাইসুলও জানেন না, খাবারের ব্যবসা চালাতে এখন থেকে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন নিতে হবে।
অথচ নতুন প্রবিধান অনুযায়ী, রাস্তার পাশের অস্থায়ী খাবারের দোকান থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁ, বেকারি, মিষ্টির দোকান, খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও নির্ধারিত শ্রেণির আমদানিকারকদের নিবন্ধন বা লাইসেন্সের আওতায় আনা হচ্ছে। আগামী ১ নভেম্বর থেকে এজন্য আবেদন গ্রহণ শুরু হবে বলে জানিয়েছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।
খাদ্য ব্যবসার একটি বড় অংশকে নিবন্ধনের আওতায় আনার এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য সংরক্ষণ করা এবং তদারকির আওতা বাড়ানো। তবে বাস্তবায়নের শুরুতেই প্রশ্ন তৈরি করেছে মাঠপর্যায়ে বিক্রেতাদের অজ্ঞতা। ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কীভাবে নিবন্ধন করবেন, কী কী কাগজপত্র লাগবে, কীভাবে আবেদন করতে হবে এবং নিয়ম না মানলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে — এসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা না থাকলে নতুন বিধান তাঁদের জন্য বাড়তি জটিলতা তৈরি করতে পারে।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, শুরুতেই অভিযান চালিয়ে ব্যবসায়ীদের শাস্তির আওতায় নেওয়া হবে না। প্রথমে আইন সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির জন্য প্রচার, লিফলেট বিতরণ ও গণমাধ্যমে প্রচার চালানো হবে। এরপর ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতির জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হবে; সেই সময় শেষ হলে অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
গত ১৬ জুলাই ‘নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬’ সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়। নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর আওতায় প্রণীত এই প্রবিধানমালায় নির্ধারিত শ্রেণির খাদ্য ব্যবসা ও খাদ্যপণ্যের জন্য নিবন্ধন এবং লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
প্রবিধানমালায় ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসা ও খাদ্য স্থাপনার জন্য নিবন্ধনের বিধান রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রেস্তোরাঁ, বেকারি, পেস্ট্রি শপ, ফলের রসের দোকান, ক্যাটারিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, মিষ্টির দোকান, দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এবং মোড়কজাত খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। এছাড়া পাইকারি মুদি খাদ্য ব্যবসা, খাদ্য সংরক্ষণাগার ও কোল্ড স্টোরেজ এবং নির্ধারিত শ্রেণির খাদ্য আমদানি, উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, মজুত, রপ্তানি ও বিপণন কার্যক্রমও এই ব্যবস্থার আওতায় আসবে।
পথের ধারে পিঠা, পুরি, পেঁয়াজু কিংবা অন্যান্য খাবার বিক্রি করা অস্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদেরও নিবন্ধন নিতে হবে। ফলে এত দিন যেসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মূলত স্থানীয় ক্রেতাদের কাছে সরাসরি খাবার বিক্রি করতেন, তাঁদেরকেও এখন নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত হতে হবে।
অন্যদিকে, বিশেষায়িত খাদ্যপণ্যের উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, মজুত, আমদানি ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত নির্ধারিত ব্যবসার জন্য লাইসেন্সের বিধান রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য সহায়ক ও সম্পূরক খাদ্য, বিশেষ পথ্য, চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিশেষ পথ্য, প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক খাদ্য এবং নিউট্রাসিউটিক্যালসহ সংশ্লিষ্ট পণ্য। শিশুদের ফর্মুলা দুধ এবং নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য তৈরি বিশেষ খাদ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বিধান অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ সব খাদ্য ব্যবসার জন্য একই ধরনের অনুমোদন প্রয়োজন হবে না; ব্যবসার ধরন ও পণ্যের শ্রেণি অনুযায়ী নিবন্ধন অথবা লাইসেন্স নিতে হবে।
নতুন প্রবিধানমালার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রচলিত ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসার প্রথমবার নিবন্ধন বিনামূল্যে করার বিধান। তবে বিশেষায়িত খাদ্যপণ্যের লাইসেন্সের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফি দিতে হবে। প্রবিধানমালায় প্রিমিসেস লাইসেন্সের ফি প্রতিষ্ঠানের আয়তনের ভিত্তিতে নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে: ১০০ বর্গমিটার বা তার কম আয়তনের প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন লাইসেন্সের ফি ১০ হাজার টাকা, আর ১০ হাজার বর্গমিটারের বেশি আয়তনের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই ফি ৬০ হাজার টাকা।
নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত ফরম ৫.১ এবং লাইসেন্সের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ফরম ৬.১, ৭.১, ৮.১ ও ৯.১ অনুযায়ী আবেদন করতে হবে। প্রাথমিকভাবে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট জেলা কার্যালয়ে আবেদন করার সুযোগ থাকবে; পর্যায়ক্রমে আবেদন প্রক্রিয়া পুরোপুরি অনলাইনে নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে কর্তৃপক্ষের। প্রতিটি খাদ্যপণ্যের মোড়কে বিএফএসএর নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ করার বিধানও রাখা হয়েছে, যাতে ভোক্তারা পণ্যের নিবন্ধন-সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করতে পারেন এবং কোনো অভিযোগ জানাতেও এই নম্বর ব্যবহার করা যায়।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মনিটরিং অফিসার ইমরান হোসেন মোল্লা বলেন, নতুন প্রবিধানমালা বাস্তবায়নের আগে ব্যবসায়ীদের আইন সম্পর্কে জানানোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এজন্য প্রচারণা চালানো, লিফলেট বিতরণ এবং গণমাধ্যমে তথ্য প্রচারের পরিকল্পনা রয়েছে। সচেতনতা কার্যক্রমের পর ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতির জন্য নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হবে; এরপর নিয়ম বাস্তবায়নে অভিযান পরিচালনা করা হবে। অর্থাৎ শুরুতেই অভিযান নয় — আগে আইনটি সম্পর্কে জানানো, পরে তা পরিপালনে ব্যবসায়ীদের বাধ্য করার পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষের।
কর্তৃপক্ষের সদস্য (আইন ও নীতি) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, খাদ্য ব্যবসার নিবন্ধন ব্যবস্থা সম্প্রসারণের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি তালিকার আওতায় আনা। বিশেষ করে ফুটপাতের খাবারের দোকানসহ ছোট পরিসরের যেসব ব্যবসা এতদিন তদারকির আওতায় যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল না, সেগুলোর তথ্য সংরক্ষণে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর মতে, নিবন্ধনের মাধ্যমে কোন এলাকায় কী ধরনের খাদ্য ব্যবসা রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ও অবস্থান সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য থাকবে; এতে খাদ্য নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অভিযোগের অনুসন্ধান, তদারকি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।
তবে মাঠপর্যায়ের প্রশ্নগুলোও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নিবন্ধন প্রক্রিয়া কতটা সহজ হবে, কী ধরনের পরিচয়পত্র বা নথি প্রয়োজন হবে, অস্থায়ী দোকান কিংবা ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের ঠিকানা কীভাবে নথিভুক্ত করা হবে এবং নিবন্ধনের পর নিয়মিত তদারকি কীভাবে হবে — এসব বিষয়ে স্পষ্টতা আসা দরকার। ১ নভেম্বর আবেদন গ্রহণ শুরুর আগে কর্তৃপক্ষের প্রচারণা সেই স্পষ্টতা কতটা তৈরি করতে পারে, সেদিকেই এখন নজর সোহেল-আনোয়ারদের মতো হাজারো ক্ষুদ্র খাবার বিক্রেতার।






