তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করার দায়ে মেটাকে ২৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানা
ব্যবহারকারীদের তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে ভোক্তাদের ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্ত করার দায়ে মেটা প্ল্যাটফর্মসকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যকে ২৫ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন একজন বিচারক। ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এই রায় যুক্তরাষ্ট্রে কোনো একটি অঙ্গরাজ্যের পক্ষে কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধে পাওয়া সবচেয়ে বড় রায়গুলোর একটি বলে মনে করা হচ্ছে।
বিচারক ফ্রান্সিস ম্যাথিউ তাঁর আদেশে লিখেছেন, বছরের পর বছর ধরে জনসমক্ষে পদ্ধতিগতভাবে চালিয়ে যাওয়া ফেসবুকের এই অন্যায় প্রতিষ্ঠানটির মূল ব্যবসায়িক চর্চার একেবারে কেন্দ্রে গিয়ে লাগে। রায়ের তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় পর এই আদেশ এলো। বিচারক জানান, অঙ্গরাজ্যের আইন অনুযায়ী ২১৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি জরিমানা যুক্তিসংগত হতো, তবে তিনি সেই অঙ্ক কমিয়ে ২৫ বিলিয়ন ডলারে নির্ধারণ করেছেন।
নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেজ বলেছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধে কোনো একক অঙ্গরাজ্যের পাওয়া সবচেয়ে বড় রায়গুলোর একটি—হয়তো সবচেয়ে বড়টিই। তাঁর মতে, এই রায় সিলিকন ভ্যালির জন্য একটি স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বার্তা হওয়া উচিত।
মেটার পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া এসেছে প্রধান আইনি কর্মকর্তা সি জে মাহোনির মাধ্যমে। তিনি বলেন, আপিলে জয় পাওয়ার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি আত্মবিশ্বাসী। তাঁর ভাষায়, এই রায় এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের এই ধরনের প্রয়োগপদ্ধতি নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যে ব্যবসা করা প্রায় অসম্ভব করে তুলবে। মাহোনি আরও বলেন, এই মামলার মূলে রয়েছে অনলাইনে মানুষ কী বলতে পারবে, সেই বিষয়ে নতুন নিয়ম চাপিয়ে দেওয়ার জন্য বক্তব্যের ওপর এক ধরনের কর আরোপের চেষ্টা।
মামলাটির শিকড় ২০২১ সালে। কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা নামের একটি তৃতীয় পক্ষের অ্যাপের মাধ্যমে সর্বোচ্চ আট কোটি ৭০ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল—এই তথ্য প্রকাশের পর নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল মেটার বিরুদ্ধে মামলা করেন।
কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা ছিল একটি ব্রিটিশ রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, যা এখন আর নেই। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৬ সালের নির্বাচনের মৌসুমে ফেসবুকের তথ্য ব্যবহার করে লক্ষ্যভিত্তিক রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন তৈরি করেছিল; সে সময় এটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফল প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণার জন্য কাজ করছিল।
অঙ্গরাজ্যের অভিযোগ ছিল, কার কাছে ব্যবহারকারীদের তথ্যে প্রবেশাধিকার রয়েছে এবং প্ল্যাটফর্মে ঘৃণামূলক বক্তব্য ও ভুল তথ্য সামলানোর বিষয়ে ফেসবুক নিউ মেক্সিকোর ব্যবহারকারীদের মিথ্যা বলেছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা ২০১০ সালে ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত ফেসবুকের প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গের একটি লেখার উল্লেখ করেন, যেখানে তিনি লিখেছিলেন প্রতিষ্ঠানটি ব্যবহারকারীদের তথ্য বিক্রি করে না।
তাঁদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি জানত তৃতীয় পক্ষগুলোর ব্যবহারকারীদের তথ্যে ব্যাপক প্রবেশাধিকার রয়েছে, এবং কোম্পানির মুনাফার জন্য সুবিধাজনক হলে ঘৃণামূলক বক্তব্য বা অন্য ক্ষতিকর বিষয়বস্তুও তারা সহ্য করেছে। এই অভিযোগগুলোর ওপর ভর করেই আদালত ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত বলে রায় দিয়েছেন।
এই মামলা মেটার একমাত্র আইনি চাপ নয়। কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকের প্রভাব নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি হাজার হাজার মামলা এবং আইনপ্রণেতাদের চাপের মুখে রয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ফেডারেল আদালতে অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলদের একটি জোটের আনা মামলার বিচার গত আগস্টে শুরু হয়েছে। সেই মামলায় অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামকে শিশুদের জন্য আসক্তিকর করে তৈরি করেছে। এতে প্রতিষ্ঠানটিকে বিশাল ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে এবং প্ল্যাটফর্মগুলোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে বাধ্য করা হতে পারে। একই বিচারে ২৯টি অঙ্গরাজ্যের সেই দাবিও শুনানি হবে যে, প্রতিষ্ঠানটি ফেডারেল আইন লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে শিশুদের তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহার করেছে।
এর আগে কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা-সংক্রান্ত দাবিতে আরও ছয়টি অঙ্গরাজ্য ৪৫ কোটি ৯০ লাখ ডলারে নিষ্পত্তি করেছিল, যা ছিল আগস্টে হওয়া ১৭ বিলিয়ন ডলারের বহু-অঙ্গরাজ্য নিষ্পত্তির অংশ। সেই নিষ্পত্তিতে প্রতিষ্ঠানটির প্ল্যাটফর্ম কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করেছে—এমন দাবিগুলোর মীমাংসা হয়েছিল।
চলতি বছরের শুরুতেই ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে তরুণদের যৌন শোষণে সহায়তা এবং প্ল্যাটফর্মগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগে দুটি বিচারে মেটার বিরুদ্ধে ৯৪ কোটি ২০ লাখ ডলারের রায় পেয়েছিল নিউ মেক্সিকো। অর্থাৎ এই অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে মেটার আইনি লড়াই একাধিক ফ্রন্টে চলছে এবং নতুন রায় সেই চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিল।
কর্পোরেশনগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর নীতির পক্ষে কাজ করা অলাভজনক সংস্থা আমেরিকান ইকোনমিক লিবার্টিজ প্রজেক্ট বলেছে, ২৫ বিলিয়ন ডলার মেটার জন্য সমুদ্রে এক ফোঁটা পানির মতো হলেও এই জরিমানা দেখিয়ে দিচ্ছে মানুষ জবাবদিহি চায়। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক নিধি হেগড়ে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি এখন ‘মিউজ’ নামের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহকারী চালু করছে, যা মানুষকে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে চিকিৎসা তথ্য পর্যন্ত সবকিছু দিয়ে বিশ্বাস করতে উৎসাহ দিচ্ছে; তাই দাঁতযুক্ত আইন ও সাহসী প্রয়োগকারীদের প্রয়োজন আরও বেশি। আপিলের ফলাফলই এখন নির্ধারণ করবে এই ঐতিহাসিক জরিমানা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে কি না।






