জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস আজ: ৬০ হাজার চালককে প্রশিক্ষণ, আসছে সড়ক নিরাপত্তা আইন ২০২৬
আজ বৃহস্পতিবার দেশব্যাপী পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। সড়ক দুর্ঘটনা কমানো, মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে দিবসটি পালিত হচ্ছে।
এবারের প্রতিপাদ্য—‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সড়ক নিরাপত্তাকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে এবারের আয়োজনে। এ লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন, চালক, পথচারী ও সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানুষের জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা, নির্বিঘ্ন যাতায়াত এবং টেকসই যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে সড়ক নিরাপত্তা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
দিবসটি উপলক্ষে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পেশাদার গাড়িচালকদের স্বাস্থ্য ও চক্ষু পরীক্ষা, মাদক পরীক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও যুবসমাজকে সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা, সড়কের সাইন-সিগন্যাল ও রোড মার্কিং সংস্কার এবং দক্ষতার ভিত্তিতে পেশাদার চালকদের পুরস্কৃত করা।
পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে প্রচার-প্রচারণা ও ম্যারাথন আয়োজনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ অনুসরণ করে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ গতি, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ক্ষেত্রে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমিয়ে আনা সম্ভব।
বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা জোরদারে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা একযোগে কাজ করছে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর জাতীয় মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। সড়ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষামূলকভাবে ১৪০ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়কে সেফটি ইমপ্রুভমেন্ট কার্যক্রম বাস্তবায়ন এবং প্রায় ৬০০ কিলোমিটার মহাসড়কে বিভিন্ন নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
পেশাদার মোটরযানচালকদের দক্ষতা বাড়াতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) মাধ্যমে ৬০ হাজার চালককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চালকদের দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি, ট্রাফিক আইন মেনে চলা এবং ঝুঁকিপূর্ণভাবে যানবাহন চালানোর প্রবণতা কমানোই এই প্রশিক্ষণের অন্যতম লক্ষ্য।
দুর্ঘটনার পর দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও সড়ক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ লক্ষ্যে স্বাস্থ্য খাতে ৪০টি বেসিক লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্স ও ৪০টি মোটরসাইকেল অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহ করা হয়েছে, যাতে দুর্ঘটনাস্থল থেকে আহত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া ও প্রাথমিক জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়।
এ ছাড়া মহাসড়কে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং যান চলাচল পর্যবেক্ষণে সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও দুর্ঘটনা শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ রয়েছে।
আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন, ২০২৬’ প্রণয়নের কার্যক্রম চলছে এবং একটি জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামোর মাধ্যমে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয়, নীতিগত দিকনির্দেশনা ও কার্যক্রমের তদারকি জোরদার করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমাতে স্ট্যান্ডার্ড হেলমেট এনফোর্সমেন্ট গাইডলাইন এবং যানবাহনের গতিসীমা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে স্পিড ম্যানেজমেন্ট ম্যানুয়াল প্রণয়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন বা আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়। চালকের বেপরোয়া গতি, ট্রাফিক আইন অমান্য, অদক্ষতা, যানবাহনের ত্রুটি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং ও পথচারীদের অসচেতনতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। পাশাপাশি সড়কের নকশাগত ত্রুটি, পর্যাপ্ত সাইন-সিগন্যালের অভাব, ফুটপাত দখল ও সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও নিরাপদ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক নিরাপত্তাকে কেবল একটি দিবসের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। সারা বছর ধরে সচেতনতামূলক কার্যক্রম, দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণ, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক চিহ্নিতকরণ এবং গৃহীত পদক্ষেপের ফলাফল মূল্যায়ন করতে হবে। দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের পাশাপাশি পরিবহন মালিক-শ্রমিক, চালক, যাত্রী ও পথচারীসহ সবার দায়িত্ব। চালকদের ট্রাফিক আইন মেনে চলা এবং যাত্রীদের চলন্ত গাড়িতে ওঠানামা থেকে বিরত থাকা—এমন আচরণগত পরিবর্তনের ওপরও জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।






