সংখ্যালঘু নির্যাতন ও ধর্মীয় উগ্রবাদ আওয়ামী লীগের আমলে ছিল ‘রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়’: হাসনাত আবদুল্লাহ
আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংখ্যালঘু নির্যাতন ও ধর্মীয় উগ্রবাদ ছিল ‘স্টেট স্পন্সরড’ বা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত—এমন বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাহীন বাংলাদেশে সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি উৎসবমুখর পরিবেশে ধর্মীয় উৎসব পালন করতে পারছেন।
বুধবার (২১ অক্টোবর) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন। দীর্ঘ ওই পোস্টে তিনি আওয়ামী লীগের সংখ্যালঘু রাজনীতির কৌশল নিয়ে বিস্তারিত অভিযোগ তোলেন।
হাসনাত আবদুল্লাহ লেখেন, ‘এখন স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে, সংখ্যালঘু নির্যাতন আর ধর্মীয় উগ্রবাদ—এই দুটি এলিমেন্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ‘স্টেট স্পন্সরড’। পূজায় আওয়ামী সুবিধাভোগী বিভিন্ন গ্রুপকে দিয়ে ম্যানুফ্যাকচারড সাবোটাজ (নাশকতা) ঘটিয়ে সেটার দায় দেওয়া হতো বিভিন্ন পক্ষকে। এতে যেমন হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিভেদ বাড়ত, তেমনি আওয়ামী লীগ ছাড়া সংখ্যালঘুরা অন্য কোথাও নিরাপদ নয় বলে জোরদার প্রচারণাও চলত।’
তাঁর ভাষ্য, এই বয়ান বিক্রি করাই ছিল আওয়ামী শাসনের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। তিনি বলেন, ‘দেশে সংখ্যালঘু বাঁচাতে আওয়ামী লীগের কোনো বিকল্প নাই, কিংবা উগ্রবাদের কল্পিত উত্থানে বাংলাদেশ আফগানিস্তান হবে—আওয়ামী লীগ বহুভাবে এসব গল্প বিক্রি করেছে দেশে ও বিদেশে। সেজন্য তাদের সময়ে একদিকে সাজিয়েছে জঙ্গিবাদের নাটক, অন্যদিকে চলেছে পূজামণ্ডপের প্রতিমা ভাঙচুর।’
এনসিপির এই নেতা আরও বলেন, আওয়ামী লীগের পালানোর সঙ্গে সঙ্গে ৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে এই ঘটনাগুলোও উল্লেখযোগ্যভাবে উধাও হয়ে গেছে। তাঁর মতে, এটাই প্রমাণ করে আগের ঘটনাগুলো কতটা সাজানো ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল।
তবে দেশের অস্থিরতার আসল চরিত্র নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে যেসব অস্থিরতা আছে অথবা চাঁদাবাজি, ব্যবসা ও ভূমিদখল ইত্যাদি অপরাধ ও নিরাপত্তাহীনতা আছে, সেটা মোটা দাগে সাম্প্রদায়িক সমস্যা নয়। বেশিরভাগই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অপরাধ-সংশ্লিষ্ট।’
তিনি বলেন, ‘সাধারণ হিন্দু এবং সাধারণ মুসলমান উভয়েই এসব অপরাধের ভুক্তভোগী। সংখ্যাগুরু কিংবা সংখ্যালঘু, সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ক্ষমতাহীন নাগরিকই ক্ষমতাসীন দলের চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন। রাজনৈতিক, আমলাতান্ত্রিক ও বিভিন্ন বাহিনীর প্রভাবশালীদের ক্ষমতাচর্চার শিকার হচ্ছেন। ক্ষেত্রবিশেষে সম্পদ ও ভূ-সম্পত্তি জবরদখলের শিকারও হচ্ছেন।’
আইনের শাসন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এসবের বিপরীতে আওয়ামী লীগ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না করে সিলেক্টিভলি সনাতন ধর্মাবলম্বী নাগরিকদের কেসগুলোকে পিক করে কিংবা নিজেরাই সেসব স্টেজ করে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বয়ান উৎপাদন করে গেছে। আওয়ামী লীগের সংখ্যালঘু রাজনীতির মুখোশ আজকে খসে পড়েছে।’
হাসনাত আবদুল্লাহর মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ আইনের শাসনেই। তিনি বলেন, ‘বাস্তবে অপরাধকে যত বেশি বিচার প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসা যাবে এবং আইনশৃঙ্খলা প্রশ্নে নাগরিকদের যত বেশি সুরক্ষা দেওয়া যাবে, সমাজ থেকে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতার বিষবাষ্পও তত দ্রুত চলে যাবে।’
দুর্গাপূজার প্রসঙ্গ টেনে তিনি উল্লেখ করেন, ‘৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী আওয়ামী লীগবিহীন সময়ে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া পরপর তিন বছর বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান দুর্গাপূজা প্রায় নির্বিঘ্নে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে কেটেছে। এটা বাংলাদেশের ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অসাধারণ বহিঃপ্রকাশ।’
বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি ‘নতুন রাষ্ট্র গঠনের সাধনায় নিঃসন্দেহে অত্যন্ত আনন্দের সংবাদ ও তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন’ বলে দাবি করেন। এটি নতুন বাংলাদেশের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এই অর্জনকে ‘জুলাইয়ের অর্জন’ অভিহিত করে তিনি নতুন ও সুন্দর বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানান। দুর্গাপূজা শেষ হওয়ার পরপরই এমন মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে—কারণ এতে একদিকে অতীত শাসনের চরিত্র নিয়ে বড় অভিযোগ তোলা হয়েছে, অন্যদিকে বর্তমান সম্প্রীতির চিত্রকে সামনে আনা হয়েছে।
এখন দেখার বিষয়, হাসনাত আবদুল্লাহর এই বক্তব্য নিয়ে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়া কী আসে এবং সংখ্যালঘু নিরাপত্তা প্রশ্নে তাঁর তোলা অভিযোগগুলো নিয়ে প্রকাশ্য বিতর্ক কতদূর গড়ায়।




