নভেম্বরে ফের ইরানে হামলার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের, মহড়া বাড়িয়েছে দুই দেশের বাহিনী
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করেছে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। মার্কিন কর্মকর্তারা এবং পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত কয়েকজন ব্যক্তি মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
স্বল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপক ও তীব্র সামরিক অভিযান চালানোর এই পরিকল্পনা এগিয়ে চলার পাশাপাশি দুই দেশের সামরিক বাহিনী তাদের মহড়াও বাড়িয়েছে। হামলার কৌশল অনুশীলনের জন্য তারা ইরাকের আকাশসীমার ওপর দিয়ে যুদ্ধবিমান উড়িয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন হামলার বিষয়ে আলোচনা করতেই প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এ সপ্তাহে ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন।
সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে থাকতে পারে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো, পারমাণবিক স্থাপনা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ভান্ডার। কয়েকজন কর্মকর্তা মনে করেন, আরও এক দফা বড় ধরনের হামলা ইরানের অর্থনীতিকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে। এর ফলে প্রায় আট মাস ধরে চলা সংঘাতের পর তেহরান কূটনৈতিক আলোচনায় ছাড় দিতে বাধ্য হতে পারে।
তবে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তা গত ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রথম দফার তীব্র হামলার চেয়ে বেশি সফল হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ওই সময়ের সংঘাত বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম ও মূল্যস্ফীতি বাড়িয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল করেছিল এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের মজুতের ওপর পেন্টাগনের চাপ মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছিল।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে হামলার অনুমোদন দেবেন কি না, তা নিয়েও যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে। চলতি বছর তিনি একাধিকবার বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর পরিকল্পনায় ভেটো দিয়েছেন। চলতি মাসেও এমনটি ঘটেছে, যখন মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী হামলা চালানোর জন্য প্রায় পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল।
ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলা চালালে এবার পাল্টা হামলার পরিধি আরও বাড়ানো হবে। আঞ্চলিক বাণিজ্যিক জাহাজ ও জ্বালানি অবকাঠামোর বাইরে গিয়ে তথ্যকেন্দ্র বা ডেটা সেন্টার এবং সমুদ্রের তলদেশে থাকা ইন্টারনেট কেব্লও হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তাঁদের বক্তব্য, এবারের লড়াই দ্রুত শেষ হবে না, আবার তা সীমিত পরিসরেও আটকে থাকবে না।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ সামরিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম জড়ো করছে, যা নভেম্বরের শুরুর দিকে পুরোপুরি প্রস্তুত অবস্থায় থাকবে। পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে নিজেদের দাবিতে অগ্রগতি অর্জনের জন্য মার্কিন আলোচকেরা সম্ভাব্য নতুন যুদ্ধের হুমকিকে তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।
তবে এখন পর্যন্ত ইরানের আলোচকেরা পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো ছাড় দিতে রাজি হননি। তাঁদের অবস্থান হলো, আলোচনার পরবর্তী পর্যায়ে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে। মার্কিন পরিকল্পনাকারীদের কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, টানা তিন দিনের একটি তীব্র সামরিক অভিযান ইরানের অর্থনীতির এতটাই ক্ষতি করতে পারে যে দেশটি আলোচনায় নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হবে। কিন্তু মার্কিন কর্মকর্তারা এর আগেও বারবার ইরানের পতনের পূর্বাভাস দিয়েছেন। অন্যদিকে পশ্চিমা কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন, অর্থনৈতিক চাপের মুখেও ইরান সরকার এখন পর্যন্ত টিকে রয়েছে।
বাইডেন প্রশাসনের সময় পেন্টাগনের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক নীতির শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ডানা স্ট্রুল বলেন, ‘যুদ্ধের এই পর্যায়ে এসে বিষয়টি স্পষ্ট যে, এখন পর্যন্ত পরিচালিত প্রচলিত সামরিক অভিযান, বর্তমানের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন নৌ অবরোধ—কোনোটিই ইরানি সরকারকে অর্থবহভাবে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে পারেনি।’ বর্তমানে ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসিতে কর্মরত স্ট্রুলের মতে, ট্রাম্প কিংবা নেতানিয়াহু কেউই এখনো এমন কোনো বিশ্বাসযোগ্য যুক্তি তুলে ধরতে পারেননি, যা ব্যাখ্যা করে আরও যুদ্ধ কীভাবে এই কৌশলগত সংকটের সমাধান করবে।
ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনও নতুন যুদ্ধের পরিকল্পনায় জটিলতা তৈরি করতে পারে। আগামী ২৭ অক্টোবর সেখানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু নির্বাচনে হেরে গেলে তিনি অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন; সে অবস্থায় তাঁর পক্ষে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করা কঠিন হবে। তবে কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আসন্ন যৌথ হামলার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে নেতানিয়াহু তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারেন, যার মাধ্যমে তিনি ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ আরও দীর্ঘ করতে পারবেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর নেতানিয়াহু এমনই একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করেছিলেন; সে সময় বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্যকে যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এখন সবার চোখ মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরের সপ্তাহগুলোর দিকে—ওয়াশিংটন ও তেল আবিব শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয় কি না, তার ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের পরবর্তী অধ্যায়।





