এডিএইচডি থাকলে অকালমৃত্যুর ঝুঁকি ৭১ শতাংশ বেশি: ওষুধে মিলতে পারে সুরক্ষা, বলছে বিশাল গবেষণা
মনোযোগ-ঘাটতি ও অতিসক্রিয়তাজনিত ব্যাধি বা এডিএইচডিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অকালমৃত্যুর ঝুঁকি এই রোগ নেই এমনদের তুলনায় প্রায় ৭১ শতাংশ বেশি — জামা নেটওয়ার্ক ওপেনে প্রকাশিত এক বড় পর্যালোচনা গবেষণায় এমনটাই উঠে এসেছে। তবে আশার কথা, চিকিৎসকের পরামর্শে এডিএইচডির ওষুধ সেবনকারীদের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি কমার ইঙ্গিতও পেয়েছেন গবেষকেরা।
গবেষকেরা তিনটি মহাদেশের প্রায় এক কোটি ৬০ লাখ মানুষের ওপর করা ১৯টি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। এই অবস্থার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বোঝাই ছিল এই পর্যালোচনার উদ্দেশ্য।
গবেষণায় আত্মহত্যা ও আঘাতের মতো অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ যেমন বিবেচনা করা হয়েছে, তেমনি হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের মতো শারীরিক অসুস্থতাজনিত স্বাভাবিক মৃত্যুর কারণও খতিয়ে দেখা হয়েছে। সব শ্রেণিতেই এডিএইচডি আক্রান্তদের মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে বেশি পাওয়া গেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র আত্মহত্যার ক্ষেত্রে — এ খাতে মৃত্যুঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ, অর্থাৎ ৮৯ শতাংশ বেশি। গাড়ি দুর্ঘটনাসহ ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত আঘাতে মৃত্যুর ঝুঁকি ৫৫ শতাংশ বেশি, আর স্বাভাবিক কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি ২৭ শতাংশ বেশি পাওয়া গেছে।
গবেষণাটির জ্যেষ্ঠ লেখক, ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের বার্ধক্য ও ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জশুয়া স্টট এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, ‘আমরা দেখেছি, এডিএইচডি আক্রান্তরা শুধু আত্মহত্যা ও আঘাতেই নয়, স্বাভাবিক কারণেও বেশি মৃত্যুঝুঁকিতে আছেন। এটি প্রমাণ করে, তাদের মুখোমুখি স্বাস্থ্য-বৈষম্য ব্যাপক ও বিস্তৃত।’
গবেষকদের মতে, স্বাভাবিক মৃত্যুর বাড়তি ঝুঁকির পেছনে প্রায়ই ধূমপান ও মাদক ব্যবহারের মতো দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাস এবং দৈনন্দিন কাজ গুছিয়ে করার সক্ষমতার ঘাটতি কাজ করে — যা দীর্ঘমেয়াদি রোগ সামলানো, চিকিৎসকের কাছে যাওয়া ও চিকিৎসা পরিকল্পনা মেনে চলাকে কঠিন করে তোলে।
ওষুধের প্রভাব নিয়ে করা এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যেসব এডিএইচডি আক্রান্ত ব্যক্তি নির্ধারিত ওষুধ সেবন করেছেন, তাদের যেকোনো কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি ওষুধ না খাওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় ২৫ শতাংশ কম। গবেষকদের ধারণা, কার্যকর চিকিৎসা এই অবস্থার সঙ্গে যুক্ত কিছু আচরণগত প্রভাব ও স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে পারে।
স্টট বলেন, ‘এডিএইচডি সংজ্ঞাগতভাবেই জীবন-সীমাবদ্ধ কোনো অবস্থা নয়; সঠিক সহায়তা ও চিকিৎসা পেলে মানুষ দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনযাপন করতে পারে। আমাদের ফলাফল বলছে, যাদের এডিএইচডি থাকতে পারে, সবার সঠিক রোগনির্ণয় ও চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।’
তবে গবেষকেরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতার কথাও জোর দিয়ে বলেছেন। অন্তর্ভুক্ত সব গবেষণাই পর্যবেক্ষণমূলক — অর্থাৎ ফলাফলগুলো সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়, সরাসরি কারণ-প্রভাব প্রমাণ করে না। ওষুধসংক্রান্ত ফলাফল এসেছে ১৯টির মধ্যে মাত্র তিনটি গবেষণা থেকে, তাই তা এখনো প্রাথমিক ও অনেক ছোট একটি গোষ্ঠীর ওপর ভিত্তি করে পাওয়া।
এ ছাড়া রোগনির্ণয়ের মানদণ্ড, স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ ও অনুসরণ পদ্ধতির ভিন্নতায় বিভিন্ন গবেষণার ফলাফলে ব্যাপক তারতম্য ছিল; আর্থসামাজিক অবস্থা ও অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মতো বিষয়গুলোও সব তথ্যভান্ডারে নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি।
গবেষণার প্রথম লেখক, লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের গবেষণা সহকারী লুসি করিগান বলেন, ‘আমাদের ফলাফল প্রাথমিক প্রমাণ দেয় যে ওষুধ এডিএইচডি আক্রান্তদের স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, তবে এটি অল্প কয়েকটি গবেষণার ওপর ভিত্তি করে পাওয়া; এই সম্পর্ক পরিষ্কার করতে আরও গবেষণা দরকার।’ তিনি যোগ করেন, ‘ওষুধ গল্পের একটি অংশ মাত্র; অনেক এডিএইচডি আক্রান্ত ব্যক্তি ব্যাপক ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও সহায়তা থেকে উপকৃত হন।’
বার্ধক্য ও স্মৃতিভ্রংশ বিশেষজ্ঞ ডা. এলিজাবেথ ল্যান্ডসভার্ক, যাঁর আলঝেইমার ও জ্ঞানীয় অবক্ষয়ের রোগী চিকিৎসার ২০ বছরের বেশি অভিজ্ঞতা আছে, বলেন, এডিএইচডি আক্রান্তদের কাজ গুছিয়ে করতে বেশি অসুবিধা হতে পারে — যা জ্ঞানীয় দুর্বলতার বাড়তি ঝুঁকির একটি কারণ হতে পারে। সামগ্রিকভাবে, গবেষণাটি এডিএইচডিকে কেবল মনোযোগের সমস্যা হিসেবে না দেখে সার্বিক স্বাস্থ্যের প্রশ্ন হিসেবে দেখার তাগিদ দিচ্ছে।





