এক মাস খালে আটকে থাকা হাঙর ‘বুকাঙি’ অবশেষে মুক্ত সাগরে, তৃতীয় চেষ্টায় সফল উদ্ধার
দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান বন্দরের খালে এক মাসের বেশি সময় আটকে থাকার পর অবশেষে মুক্ত সাগরে ফিরে গেছে ‘বুকাঙি’ নামে পরিচিত হাঙরটি। বুধবার তৃতীয় চেষ্টায় তাকে সফলভাবে খাল থেকে বের করে খোলা সাগরের দিকে পথ দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দেশটির মহাসাগর মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। কর্মকর্তারা আশা করছেন, হাঙরটি সময়মতো গভীর পানিতে চলে যাবে।
প্রায় তিন মিটার লম্বা এই স্ত্রী ডাস্কি হাঙরটি গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে বন্দরের খালে আটকে ছিল। বুসানের উত্তর বন্দরের কোরীয় নাম ‘বুকহাং’ থেকে তার নাম রাখা হয়েছিল বুকাঙি। ডাস্কি হাঙর বিশ্বজুড়ে বিপন্ন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ একটি প্রজাতি, ফলে তার এই দীর্ঘ অবস্থান শুরু থেকেই বিশেষ গুরুত্ব পায়।
খালে আটকে থাকার এক মাসে হাঙরটি দক্ষিণ কোরিয়ায় জাতীয় পর্যায়ের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠে। নগর কর্তৃপক্ষের হিসাবে, তাকে দেখতে এসেছিলেন ১৬ লাখের বেশি দর্শনার্থী। অথচ যে উদ্যান ঘিরে এই ভিড় জমেছিল, সেখানে ব্যস্ত একটি শনিবারেও সাধারণত প্রায় দুই হাজার মানুষ আসতেন।
কর্তৃপক্ষ এর আগে দুই দফা হাঙরটিকে সাগরে ফেরানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিল। জোর করে তাকে বের করার আরও চেষ্টা আপাতত থামিয়ে রাখা হয়েছিল, কারণ তাতে প্রাণীটির ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছিল। ধারণা ছিল, পানি ঠান্ডা হলে হাঙরটি নিজে থেকেই সরে যেতে পারে।
এই এক মাসে হাঙরটির সবচেয়ে পরিচিত পাহারাদার হয়ে ওঠেন একদল স্বেচ্ছাসেবী ইউটিউবার ও লাইভস্ট্রিমার। কোরীয় ভাষায় তাদের বলা হয় ‘জাগিয়ংদান’, যার অর্থ প্রতিবেশী পাহারাদল আর স্বঘোষিত প্রহরীর মাঝামাঝি কিছু। প্রতি রাতে উজ্জ্বল জ্যাকেট পরে, সেলফি স্টিক হাতে তারা খালের পাড়ে জড়ো হতেন হাঙরটিকে বিরক্তকারীদের থেকে রক্ষা করতে।
তারা সারা রাত জেগে পানি দিকে টর্চ বা লেজারের আলো ফেলা দর্শনার্থীদের সতর্ক করতেন। তাদের কারও কারও ভিডিও দেখা হয়েছে লাখ লাখ বার। পাহারাদারদের একজন চোই ওন-জিন জানান, অনেকে মাছ ধরার বাতি কিংবা ক্যাম্পিংয়ের আলো নিয়ে আসতেন; অনলাইনে এমন ব্যক্তিদের ‘লণ্ঠন ভিলেন’ বলা হয়।
আলোর ঝলকানি হাঙরটির জন্য বাস্তব বিপদও তৈরি করেছিল। কাছাকাছি বসবাসকারী ইউটিউবার না তাই-সু জানান, রাত দুইটায় টর্চের আলোয় চমকে হাঙরটি হঠাৎ মোচড় দিয়ে খালের পাশে আঘাত পায়, সেই দৃশ্য তার ধারণ করা ভিডিওতে ধরা পড়ে। দেশটির জাতীয় মৎস্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট পরে নিশ্চিত করে, হাঙরটির নাকে ঘষা লেগেছিল এবং কোনো দর্শনার্থীর টর্চের আলোয় চমকেই সম্ভবত এই আঘাত লেগেছে।
কোরীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, সাতটি সংস্থার ১০৫ জন কর্মকর্তা হাঙরটির ওপর নজর রাখছিলেন এবং তিন মিনিটের মধ্যে পানিতে পৌঁছাতে পারে এমন একটি দল প্রস্তুত ছিল। তবে পাহারাদার চোই এই হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন; তার ভাষ্য, রাত গভীর হলে দায়িত্ব প্রায় পুরোটাই তাদের কাঁধে এসে পড়ত।
খালের পাড়ের এলাকা মধ্যরাত থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত জনসাধারণের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছিল, তবে এত বড় উদ্যানে সেই নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি কার্যকর করা কঠিন ছিল বলে পাহারাদাররা জানান। এক রাতে লাইভস্ট্রিম চলাকালে চোই এক ব্যক্তিকে পানিতে খাবারের বর্জ্য ফেলতে দেখেন।
কেউ হাঙরটিকে খেতে দেখেনি, যদিও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, খাওয়ার ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে ঘটতে পারে এবং তার আকারের হাঙরের ঘন ঘন খাওয়ার প্রয়োজন হয় না। জাতীয় মৎস্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ডাস্কি হাঙর ১৮ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পানি পছন্দ করে; ১৫ ডিগ্রির নিচে তার শারীরিক কার্যক্রম কমতে শুরু করে এবং প্রায় ১১ ডিগ্রিতে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ে। বুসানের কর্মকর্তারা ধারণা করেছিলেন, নভেম্বরের মাঝামাঝির পর খালের পানি সেই তাপমাত্রায় নামতে পারে।
ইনস্টিটিউট আরও জানিয়েছে, এ বছরের প্রথম ছয় মাসে পূর্ব উপকূলে ৪৬টি বড় হাঙর দেখা গেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় চার গুণ। এর পেছনে সাগরের পানি উষ্ণ হওয়া এবং হাঙরের খাদ্য মাছের সংখ্যা বাড়াকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বুকাঙিকে ঘিরে মানুষের আবেগ একসময় ছোটখাটো উৎসবের রূপ নেয়। তার নামে স্মারক সোজু তৈরি হয়, বেসবল দলের মাসকট হাঙরের পোশাক পরে, তাকে শহরের সম্মানসূচক দূত করা হয় এবং আশপাশের দোকানগুলোতে বিক্রি বেড়ে যায়। অক্টোবরের মাঝামাঝি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং নিজে খালটি দেখতে আসেন।
পাহারাদারদের কেউই হাঙরটিকে জোর করে বের করে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন না। ছোট ব্যবসায়ী কিম জং-হোয়ান দিনের বেলায়ও পাহারা দিতেন এবং প্রায় প্রতিদিন লাইভস্ট্রিম করতেন। তার ভাষ্যে, হাঙরটি নিজের ইচ্ছায় এসেছে; পানি ঠান্ডা হলে, খাবার না মিললে বা পরিবেশ না মানালে সে নিজেই চলে যাবে — তত দিন তাকে শান্তিতে থাকতে দেওয়াই ভালো। বুধবারের সফল প্রত্যাবর্তনের পর এখন সবার প্রত্যাশা, বুকাঙি নিরাপদে খোলা সাগরেই থেকে যাবে।





