বিক্রি কমে যাওয়ায় ২০২০ সালে বিদায় নিয়েছিল ম্যাকডোনাল্ডসের গ্রিলড চিকেন স্যান্ডউইচ, গরুর মাংসের দাম বাড়ায় ফিরতে পারে আবার
যুক্তরাষ্ট্রের ফাস্টফুড জগতে স্বাস্থ্যকর বিকল্প হিসেবে একসময় আলাদা জায়গা করে নিয়েছিল ম্যাকডোনাল্ডসের গ্রিলড চিকেন স্যান্ডউইচ। কিন্তু ২০২০ সালে হঠাৎ করেই মেনু থেকে উধাও হয়ে যায় জনপ্রিয়তার দাবিদার এই পদটি। কেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে এত দিন নানা জল্পনা চললেও এবার প্রতিষ্ঠানটির সাবেক এক কর্মকর্তা নিজেই মুখ খুলেছেন — তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল একেবারেই সরল হিসাব: পর্যাপ্ত সংখ্যক ক্রেতা ওই স্যান্ডউইচটি কিনছিলেন না।
ম্যাকডোনাল্ডসের সাবেক কালিনারি ইনোভেশন ম্যানেজার ও শেফ মাইক হ্যারাজ ফক্স নিউজ ডিজিটালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি প্রতিষ্ঠানটির মার্কিন আউটলেটগুলোর জন্য নতুন নতুন মেনু পদ তৈরির কাজে যুক্ত ছিলেন। ফলে মেনু থেকে কোনো পদ বাদ দেওয়ার পেছনের ভেতরের হিসাব-নিকাশ সম্পর্কে তাঁর জানাশোনা প্রত্যক্ষ।
হ্যারাজ বলেন, ম্যাকডোনাল্ডসের মতো বড় করপোরেট চেইনের ক্ষেত্রে প্রতিটি মেনু পদের জন্যই একটি নির্দিষ্ট বিক্রির সীমা থাকে। কোনো পদ লাভজনক হতে হলে তাকে সেই সীমা ছাড়িয়ে বিক্রি হতে হয়। তাঁর ভাষায়, কোনো পদের বিক্রি একবার একটি নির্দিষ্ট মাত্রার নিচে নেমে গেলে সেটি মেনুতে রাখা আর্থিকভাবে অর্থহীন হয়ে পড়ে, কারণ শেষ পর্যন্ত অবিক্রীত খাবার ফেলে দিতে হয়।
গ্রিলড চিকেন স্যান্ডউইচের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৯৯৩ সালে স্বাস্থ্যকর একটি বিকল্প হিসেবে এটি প্রথম মেনুতে আসে। তখনকার একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, মেরিনেট করা চামড়াহীন মুরগির বুকের ফিলে, লেটুস, টমেটো, মিষ্টি লাল পেঁয়াজ, মন্টেরে জ্যাক চিজ ও একটি ভেষজ সস বানের ভেতরে সাজিয়ে পরিবেশন করা হতো এই স্যান্ডউইচ।
২০১৫ সালে পদটিকে নতুন রূপ দেয় ম্যাকডোনাল্ডস। তখন জানানো হয়, গ্রিলড চিকেন তৈরি হবে শুধু ক্যানোলা তেল, জলপাই তেল এবং আসল মসলা ও ভেষজ দিয়ে। নতুন রূপে পদটি বাজারে আসে ‘আর্টিজান গ্রিলড চিকেন স্যান্ডউইচ’ নামে। তবু শেষ রক্ষা হয়নি; ২০২০ সালে স্যান্ডউইচটি মেনু থেকে সরে যায়, একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মেনু থেকে সালাদও বাদ পড়ে।
স্বাস্থ্যসচেতন ক্রেতাদের কাছে পদটির আলাদা কদর ছিল বলে জানান হ্যারাজ। বিশেষ করে অভিভাবকেরা এটি পছন্দ করতেন — সন্তানেরা হ্যাপি মিল নিয়ে উচ্ছ্বসিত হলেও বাবা-মায়েরা নিজেদের জন্য তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর কিছু খুঁজতেন, আর তখন গ্রিলড চিকেনই ছিল তাঁদের পছন্দের বিকল্প।
রান্নাঘরের কারিগরি দিকও সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে। অন্য অনেক পদের মতো গ্রিলড চিকেন স্যান্ডউইচও ফ্ল্যাটটপে রান্না করে সার্বজনীন হোল্ডিং ক্যাবিনেটে সংরক্ষণ করা হতো। হ্যারাজের মতে, ম্যাকডোনাল্ডসের প্রতিটি রেস্তোরাঁ এমনভাবে সাজানো যে প্রতিটি বর্গইঞ্চি জায়গাকেই লাভজনক হতে হয়। কোনো পদ জায়গা দখল করে অথচ অর্থ না আনলে তার টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
স্বাদের প্রশ্নটিও উঠে এসেছে তাঁর বক্তব্যে। ক্রেতা সন্তুষ্টি মেনু সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে, আর হ্যারাজ মনে করেন, গ্রিলড চিকেন স্যান্ডউইচের স্বাদের ধরন অতিথিদের সব সময় মুগ্ধ করতে পারেনি। পাশাপাশি ছিল ‘মেনু ক্যানিবালাইজেশন’ বা নিজের পদের কাছেই নিজের বিক্রি হারানোর আশঙ্কা — চিকেন স্যান্ডউইচ থাকায় কেউ কেউ চিকেন ম্যাকনাগেটসের বদলে সেটি কিনতেন; স্যান্ডউইচ সরিয়ে দিলেও সেই ক্রেতারা অন্য পদ কিনবেন বলেই প্রতিষ্ঠানটির হিসাব ছিল।
তবে গল্প এখানেই শেষ নয়। সেপ্টেম্বরে বিনিয়োগকারীদের এক বৈঠকে ম্যাকডোনাল্ডসের নির্বাহীরা চিকেন পদের পরিসর বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন, যার মধ্যে গ্রিলড চিকেন স্যান্ডউইচ ও র্যাপের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনও রয়েছে। প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের চাহিদা বাড়তে থাকায় চিকেনের দিকে প্রতিষ্ঠানটির ঝোঁক বাড়ছে বলে খাদ্য খাতের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফিরে আসার সম্ভাবনা নিয়ে হ্যারাজ নিজেও আশাবাদী। তাঁর মতে, গরুর মাংসের দাম বাড়তে থাকায় অনেক চেইনই এখন বিকল্প খুঁজছে, আর তুলনামূলক সাশ্রয়ী প্রোটিন হিসেবে চিকেন সেই জায়গা নিতে পারে। তিনি বলেন, গ্রিলড চিকেন নির্দিষ্টভাবে ফিরবে কি না তা নিশ্চিত নয়, তবে চিকেন পদ সামগ্রিকভাবে আরও জনপ্রিয় হবে — শুধু গরুর মাংসের দামের কারণে নয়, যথাযথভাবে তৈরি করতে পারলে চিকেনে মুনাফার হারও বেশি।
ম্যাকডোনাল্ডসের আনুষ্ঠানিক মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোনো জবাব আসেনি। ফলে গ্রিলড চিকেন স্যান্ডউইচ সত্যিই মেনুতে ফিরছে কি না, তা এখনো জল্পনার পর্যায়েই রয়েছে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট — ফাস্টফুডের মেনু কেবল স্বাদ দিয়ে টিকে থাকে না; বিক্রির সীমা, রান্নাঘরের জায়গা, মুনাফার হার আর ক্রেতার আচরণ মিলেই ঠিক হয় কোন পদ থাকবে আর কোনটি বিদায় নেবে। ২০২০ সালে সেই হিসাবেই হারিয়ে গিয়েছিল গ্রিলড চিকেন স্যান্ডউইচ, আর বদলে যাওয়া বাজার পরিস্থিতিতে একই হিসাবই হয়তো আবার তাকে ফিরিয়ে আনবে।





