খাদ্য ব্যবসায় নিবন্ধন ও লাইসেন্স বাধ্যতামূলক: ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর, ফুটপাতের দোকানও আওতায়
দেশের খাদ্য ব্যবসায় বড় পরিবর্তন আসছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ ও খাদ্য ব্যবসায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নির্ধারিত শ্রেণির খাদ্য ব্যবসা ও খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে নিবন্ধন ও লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক করেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। আগামী ১ নভেম্বর থেকে এই বাধ্যবাধকতা কার্যকর হবে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। নিবন্ধন ও লাইসেন্সের মেয়াদ হবে তিন বছর, মেয়াদ শেষে তা নবায়ন করতে হবে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিবন্ধন বা লাইসেন্স গ্রহণের বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও তা ছাড়া খাদ্য ব্যবসা পরিচালনা করা নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার পর লাইসেন্সবিহীন খাদ্য ব্যবসা আইনি ঝুঁকিতে পড়বে।
গত ১৬ জুলাই ‘নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬’ নামে নতুন এই প্রবিধানমালা সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট সব খাদ্য ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানকে ১ নভেম্বর ২০২৬ থেকে প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ও লাইসেন্স গ্রহণের জন্য আবেদন করার আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ এবং নতুন প্রবিধানমালা অনুযায়ী, নির্ধারিত চার শ্রেণির খাদ্য ব্যবসার ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক লাইসেন্স, প্রিমিসেস লাইসেন্স, উৎপাদিত ও আমদানিকৃত পণ্যের লাইসেন্স এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত পণ্যের নিবন্ধন গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্ধারিত ১৬টি শ্রেণির খাদ্য ব্যবসা ও খাদ্য স্থাপনার ক্ষেত্রে নিবন্ধন গ্রহণের বিধান রয়েছে।
এই নিয়মের আওতা অনেক বিস্তৃত। পথের ধারে ভ্রাম্যমাণ বা অস্থায়ী খাবারের দোকান, ছোট রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে আমদানিকারক ও বড় আকারের খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান—খাদ্য ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এখন থেকে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিবন্ধন নিতে হবে। ফুটপাতের পিঠা, ঝালমুড়ি ও পেঁয়াজুর দোকানও এই আওতার বাইরে থাকছে না।
প্রবিধানের তফসিলে খাদ্য ব্যবসাকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রচলিত ১৬ ধরনের খাদ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য শুধু নিবন্ধনই যথেষ্ট হবে। তবে যারা বিশেষ ধরনের বা সুপারফুড পণ্য নিয়ে কাজ করেন, তাদের লাইসেন্স নিতে হবে।
রেস্তোরাঁ, বেকারি, ফলের রসের দোকান, পেস্ট্রি শপ ও ক্যাটারিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিবন্ধন নিতে হবে। প্যাকেটজাত বা মোড়কজাত খাবার উৎপাদনকারী, মিষ্টির দোকান, দুগ্ধপণ্য প্রস্তুতকারী এবং আমদানিকারকদেরও (কাঁচা ও তাজা খাবার বাদে) নিবন্ধন করতে হবে।
এর বাইরে পাইকারি মুদি খাদ্য ব্যবসা, কাঁচা ও তাজা খাদ্য আমদানি, খাদ্য সংরক্ষণাগার ও কোল্ড স্টোরেজ, ভোজ্যতেল ও ভোজ্য লবণ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিশেষ খাদ্য, পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য, স্বাস্থ্যসহায়ক ও সম্পূরক খাদ্য, বিশেষ পথ্য, চিকিৎসাসংক্রান্ত বিশেষ পথ্য, প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক খাদ্য, জৈব খাদ্য, কিরণ-সম্পাতকৃত খাদ্য, জিনগতভাবে পরিবর্তিত খাদ্য, অভিনব খাদ্য, ব্যবহারিক খাদ্য, একাধিক ধাপে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং খাদ্য সংযোজন দ্রব্যের উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, মজুত, আমদানি, রপ্তানি ও বিপণনসংশ্লিষ্ট নির্ধারিত ব্যবসার জন্যও নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক।
অন্যদিকে, যেসব প্রতিষ্ঠান বিশেষায়িত খাদ্যপণ্য নিয়ে কাজ করে, যেমন শিশুদের ফর্মুলা দুধ এবং বয়স্ক বা নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য তৈরি বিশেষ ধরনের খাবার, সেসব ক্ষেত্রে নির্ধারিত চার শ্রেণির ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলক লাইসেন্সের আওতায় আনা হবে। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যসহায়ক ও সম্পূরক খাদ্য, বিশেষ পথ্য ও চিকিৎসাসংক্রান্ত বিশেষ পথ্য, প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক খাদ্য এবং নিউট্রাসিউটিক্যালসহ অনুরূপ খাদ্যের উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, মজুত, আমদানি ও বিপণন।
এ ছাড়া বংশগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত বা সংশোধিত খাদ্য, জৈব খাদ্য, কিরণ-সম্পাতকৃত খাদ্য, জিনগতভাবে পরিবর্তিত খাদ্য, অভিনব খাদ্য, ব্যবহারিক খাদ্য, পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য এবং নিরাপদ খাদ্য (বিজ্ঞাপন ও দাবি) প্রবিধানমালা, ২০২৫ অনুযায়ী স্বাস্থ্যসহায়ক দাবি বা রোগের ঝুঁকি হ্রাস-সংক্রান্ত দাবিসম্পন্ন খাদ্যের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট বিধান অনুসারে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও নিবন্ধন গ্রহণ করতে হবে।
আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬-এর তফসিল-১০-এ নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে সংশ্লিষ্ট প্রবিধানে বর্ণিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আবেদন করতে হবে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ মনে করে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে খাদ্য ব্যবসার নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হবে, খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রম আরও সুশৃঙ্খল হবে এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ কার্যক্রম অধিকতর কার্যকর হবে। ১ নভেম্বর ঘনিয়ে আসায় এখন খাদ্য ব্যবসায়ীদের সামনে মূল কাজ হলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিজ নিজ শ্রেণি অনুযায়ী নিবন্ধন বা লাইসেন্সের আবেদন সম্পন্ন করা।




