ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ, পাঁচ বছরের কাজ দেখেই জনগণ ভোট দেবে: চীফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি
ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনই বর্তমান সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। তিনি বলেন, সরকারের পাঁচ বছরের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করেই জনগণ পরবর্তী নির্বাচনে ভোট দেবে। সরকার ব্যর্থ হলে জনগণই ভোটের মাধ্যমে তার জবাব দেবে — তাই ঘন ঘন আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা না করে জনগণের রায়ের জন্য অপেক্ষা করা উচিত।
বুধবার বরিশাল শিল্পকলা একাডেমি অডিটোরিয়ামে ‘করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত জিয়া মঞ্চের বরিশাল বিভাগীয় সম্মেলন-২০২৬-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সম্মেলনে বরিশাল বিভাগের মহানগর ও বিভিন্ন জেলা থেকে বিএনপির নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
চীফ হুইপ বলেন, ভঙ্গুর অর্থনীতি ও নানা সংকটের মধ্য দিয়ে বর্তমান সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশ পুনর্গঠনের উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত না করে সরকারকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। লংমার্চসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের বিদ্যমান সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের জুলুম-নির্যাতন ও প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে বিএনপি। নানা সংকটের মধ্যেও বর্তমান সরকার দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে কাজ করছে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান তুলে ধরে নূরুল ইসলাম মনি বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখসারিতে থেকে তিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন। স্বাধীনতার পর দেশের সংকটময় পরিস্থিতিতেও তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন। দলীয় ঐতিহ্য ও ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বর্তমান সরকারের কাজের ধারাবাহিকতাকে সেই ধারার অংশ হিসেবে তুলে ধরেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা উল্লেখ করে চীফ হুইপ বলেন, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁকে জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সাবেক সংসদ সদস্য বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন ও সংসদ সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম জামাল। সম্মেলনের উদ্বোধন করেন জিয়া মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক মো. ফয়েজ উল্লাহ ইকবাল। আবু তালেবের সভাপতিত্বে ও গোলাম ফারুকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সাংগঠনিক বক্তব্য দেন জিয়া মঞ্চের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার জামাল হোসেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করা হয়। পরে জাতীয় সংগীত ও দলীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। বিভাগীয় পর্যায়ের এই সম্মেলনে দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম ও আগামীর করণীয় নিয়েও নেতারা বক্তব্য রাখেন বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানা যায়।
চীফ হুইপের বক্তব্যের মূল সুর ছিল সরকারকে সময় দেওয়ার আহ্বান। তাঁর যুক্তি অনুযায়ী, অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের মতো বড় কাজের ফল জনগণের কাছে পৌঁছাতে সময় লাগে, আর সেই মূল্যায়নের ভার নির্বাচনের মাধ্যমেই জনগণের হাতে থাকা উচিত। আন্দোলনের কর্মসূচি দিয়ে সেই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হলে দেশের চলমান সমস্যার সমাধান মিলবে না বলেই তিনি মত দেন।
ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগের উল্লেখ করে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, সরকার প্রান্তিক মানুষের জীবনমানে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে। এই উদ্যোগগুলো মাঠপর্যায়ে কতটা ফল দিচ্ছে, তা নিয়েই আগামী দিনে জনমতের মূল্যায়ন গড়ে উঠবে — আর সেই মূল্যায়নই পরবর্তী নির্বাচনের ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে বলে তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত মেলে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা মহলে আলোচনা চলছে। চীফ হুইপ সরাসরি স্বীকার করেছেন, সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে ভঙ্গুর অর্থনীতি ও সংকটের মধ্য দিয়ে — অর্থাৎ চ্যালেঞ্জের কথা আড়াল না করে তিনি সময় ও সুযোগের দাবিকেই সামনে এনেছেন।
সব মিলিয়ে বরিশালের এই সম্মেলন থেকে চীফ হুইপের বার্তা ছিল দ্বিমুখী: একদিকে সরকারের সমালোচকদের প্রতি আন্দোলনের বদলে নির্বাচনের রায়ের অপেক্ষা করার আহ্বান, অন্যদিকে নিজ দলের নেতাকর্মীদের প্রতি পাঁচ বছরের কর্মকাণ্ড দিয়েই জনগণের আস্থা অর্জনের তাগিদ। শেষ পর্যন্ত সেই আস্থার পরীক্ষা হবে ভোটের মাঠেই — এই কথাটিই তিনি বারবার ফিরিয়ে এনেছেন।




