মরদেহ সরানোর পথে টেলর সুইফটের গান বাজানোর অভিযোগ, সিডনির আদালতে সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার বিচারে চাঞ্চল্যকর সাক্ষ্য
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে আলোচিত জোড়া হত্যা মামলার শুনানিতে আদালতে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর এক বিবরণ। অভিযোগ, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা বো লামার-কন্ডন দুজনের মরদেহ সরিয়ে ফেলার পথে গাড়িতে বাজিয়েছিলেন মার্কিন গায়িকা টেলর সুইফটের গান ‘নো বডি, নো ক্রাইম’। নিউ সাউথ ওয়েলসের সুপ্রিম কোর্টে বুধবার সাক্ষ্য দিতে গিয়ে অভিযুক্তের এক বন্ধু এই তথ্য জানিয়েছেন।
৩১ বছর বয়সী লামার-কন্ডনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ২০২৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি সিডনির প্যাডিংটনে জেসি বেয়ার্ডের বাড়িতে নিজের পুলিশি আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলি করে হত্যা করেন বেয়ার্ড ও তাঁর সঙ্গী লুক ডেভিসকে। তবে তিনি দুটি হত্যা এবং একটি গুরুতর অনধিকার প্রবেশের অভিযোগে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।
আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া বন্ধুটির পরিচয় ছদ্মনামে ‘এলিজাবেথ কেনেডি’ হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি—অভিযুক্ত হত্যাকাণ্ডের দুই দিন পর—লামার-কন্ডন একটি সাদা ভ্যান নিয়ে বিকেল তিনটার দিকে তাঁকে তুলে নেন। কেনেডি ভেবেছিলেন, তাঁরা দুপুরের খাবার খেতে যাচ্ছেন।
শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী জন স্ট্র্যাটন এসসি কেনেডিকে প্রশ্ন করে বোঝাতে চান, লামার-কন্ডন তাঁকে ভ্যানের পেছনে রাখা ত্রপল সরিয়ে বেয়ার্ডের মৃতদেহের মাথা দেখিয়েছিলেন এবং কেনেডিই ওই গানটি বাজানোর কথা বলেছিলেন। কেনেডি এই দুটি দাবিই অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, লামার-কন্ডন তাঁকে কোনো মরদেহ দেখাননি, আর গানটিও তিনি নিজে বেছে নেননি।
কেনেডি আদালতকে বলেন, ‘গানটা তিনিই গাড়িতে বাজিয়েছিলেন। গানটা খুবই বিশেষ ধরনের।’ তিনি জানতে চেয়েছিলেন, লামার-কন্ডন গানটি কীভাবে জানলেন। জবাবে তিনি বলেন, ‘এভারমোর’ অ্যালবাম থেকে। কেনেডি বলেন, ‘এরপর আমি ওই অ্যালবামের আরও কয়েকটি গান বাজানোর চেষ্টা করি, কিন্তু তিনি সেগুলোর কোনোটাই জানতেন না। কাজেই এই গানটা তাঁর জানা থাকাটা আমার কাছে খুব অদ্ভুত লেগেছিল।’
নিজের বর্ণনায় কেনেডি বলেন, ভ্যানের পেছনে একটি নীল ত্রপল দেখেছিলেন তিনি, আর ভেতরে লেবুর মতো একটা গন্ধ ছিল—যেন ঠিক তখনই পরিষ্কার করা হয়েছে। গাড়ি চলতে শুরু করার পর পথ ক্রমেই লম্বা হতে থাকে। আর কত দূর, জানতে চাইলেই লামার-কন্ডন বলতেন, ‘আর মাত্র ৫০ মিনিট।’ শেষ পর্যন্ত যাত্রাটি গিয়ে ঠেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরের গুলবার্ন ও বাঙ্গোনিয়ায়, সময় লাগে দুই ঘণ্টা।
কেনেডি বলেন, পুরো পথজুড়ে ভ্যানের জানালা খোলা ছিল, আর শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র পুরোদমে চালু থাকায় ভেতরে হিমশীতল ঠান্ডা ছিল। সেই পথে লামার-কন্ডনকে তাঁর ‘প্রফুল্ল’ বলেই মনে হয়েছিল। তবে একপর্যায়ে তাঁর মনে হয়, ‘কিছু একটা ভুল হয়েছে, আর তিনি আমাকে সেটা বলতে চাইছেন না।’
সাক্ষ্যে আরও এসেছে, পথে প্রায় একটি পাখির ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি হলে লামার-কন্ডন বলেছিলেন, ‘তুমি তো জানো, আমি কখনো কোনো প্রাণীকে আঘাত করব না, তাই না?’ এরপর তিনি আরেক পুলিশ কর্মকর্তা বন্ধুকে ফোন করার চেষ্টা করেন। ফোন না ধরায় তিনি অশ্রাব্য ভাষায় উদ্বেগ প্রকাশ করে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং বলতে থাকেন, ‘আমি চুপ থাকলে বুঝবে আমি রাগ করিনি, আমি শুধু ভাবছি।’
কেনেডি বলেন, লামার-কন্ডন তাঁকে জানান, তাঁকে আবার বাঙ্গোনিয়ায় ফিরতে হবে এবং সারা রাত জেগে থাকতে হবে। কেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেনেডিকে এসবের মধ্যে জড়াতে চান না বলে তিনি তা বলতে পারবেন না। এরপর ক্যাফেইনের জন্য তিনি পিচ স্বাদের লিপটন আইস টি কিনে দিতে বলেন, কারণ তিনি কফি খান না।
একটি সার্ভিস স্টেশনে কেনেডি পানীয়টি কিনতে নামলে লামার-কন্ডন তাঁকে ভ্যানে জ্বালানি ভরতেও বলেন। কিন্তু কেনেডি গাড়ি চালাতে বা জ্বালানি ভরতে জানেন না বলে তা করতে পারেননি। এতে লামার-কন্ডন দৃশ্যত বিরক্ত হন, গালি দিয়ে গাড়ি থেকে লাফিয়ে নামেন। কেন তিনি নিজে জ্বালানি ভরতে চাননি, জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি ক্যামেরায় ধরা পড়তে চান না।
স্টেশন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় কেনেডি লক্ষ্য করেন, ভ্যানের পেছনে সেই নীল ত্রপলটি আর নেই। পরে বাঙ্গোনিয়াতেই বেয়ার্ড ও ডেভিসের মরদেহ পাওয়া যায়।
আসামিপক্ষের দাবি, বেয়ার্ড ও ডেভিস ‘আত্মরক্ষা’ করতে গিয়ে দুর্ঘটনাবশত গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। স্ট্র্যাটন এসসি বলেছেন, ঘটনার পর লামার-কন্ডন ‘যথেষ্ট আতঙ্কিত’ হয়ে ঘটনাস্থল পরিষ্কার করেন এবং মরদেহগুলো সরিয়ে ফেলেন। বিচারপতি নাতালি অ্যাডামসের আদালতে মামলাটির শুনানি চলমান রয়েছে।


