রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে আর্কটিক কৌশল বদলে ফেলল ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সবার আগে নিরাপত্তা
ইউরোপীয় কমিশন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জন্য নতুন আর্কটিক কৌশল উন্মোচন করেছে, যেখানে চারটি অগ্রাধিকারের মধ্যে সবার ওপরে রাখা হয়েছে নিরাপত্তা ও স্থিতিস্থাপকতাকে। এর পরের জায়গাগুলোতে আছে জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং আর্কটিক সম্প্রদায়গুলোর জন্য সুযোগ সৃষ্টি।
মঙ্গলবার কমিশন জানায়, নতুন কৌশলে একটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা হাব গঠনের প্রস্তাব রয়েছে, যা সদস্য রাষ্ট্র ও অংশীদারদের তথ্য ভাগাভাগি করতে এবং আর্কটিক অঞ্চলে সামুদ্রিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করতে সহায়তা করবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই হাব পরবর্তী সময়ে আরও বিস্তৃত হবে — ছায়া বহরের (শ্যাডো ফ্লিট) জাহাজগুলোকে শনাক্ত ও অনুসরণ করা, অবৈধ মাছ ধরা ও দূষণ চিহ্নিত করা এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রমের সমন্বয় উন্নত করা হবে এর কাজের অংশ।
কমিশন আরও বলেছে, ইউরোপের বরফভাঙা জাহাজের (আইসব্রেকার) সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করবে ইইউ। আইসব্রেকার হলো বিশেষ ধরনের জাহাজ, যা বরফে ঢাকা পানিতে চলাচলের জন্য সমুদ্রের বরফ ভেঙে নিরাপদ নৌপথ ধরে রাখতে পারে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন বলেছেন, ‘আর্কটিক এমন একটি জায়গা, যেখানে ভূরাজনীতির টেকটোনিক প্লেটগুলো পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে।’ তাঁর মতে, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে এখন আর নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়া যায় না।
ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কাল্লাস বলেছেন, রাশিয়া সুদূর উত্তরে তার সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। এএফপি সংবাদ সংস্থার বরাতে জানা গেছে, তিনি এর উদাহরণ হিসেবে ড্রোন অনুপ্রবেশ, জিপিএস জ্যামিং ও তার (কেবল) ছিন্ন করার ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন।
নতুন কৌশলের বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর দিকেই ইঙ্গিত করে। কমিশন বলেছে, গ্রিনল্যান্ডকে সরাসরি ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত করে এমন একটি কৌশলগত প্যান-আর্কটিক ফাইবার-অপটিক টেলিযোগাযোগ তারের প্রকল্পকে সমর্থন দেবে ইইউ। এটি একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ, যা কানাডা, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকেও যুক্ত করবে।
এ ছাড়া সরকারি যোগাযোগের জন্য নিজস্ব আইআরআইএস² নক্ষত্রপুঞ্জের মাধ্যমে নিরাপদ স্যাটেলাইট সংযোগ দেবে ইইউ। এএফপি জানিয়েছে, এই ব্যবস্থাকে মার্কিন প্রযুক্তি ধনকুবের ইলন মাস্কের স্টারলিংকের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
এই কৌশলগত বদলের পেছনে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বারবার গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি। ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত এই অঞ্চলটি নিয়ে ট্রাম্পের সুর এ বছর নরম হলেও এবং গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের সঙ্গে একটি নিরাপত্তা চুক্তি সই হলেও ইউরোপের অনেকেই এখনো সতর্ক, জানিয়েছে এএফপি।
নতুন কৌশলের আগে গত মাসে জার্মানি, ফ্রান্স, ফিনল্যান্ড ও ডেনমার্কসহ ১২টি দেশের নেতারা বৈঠক করে ইইউকে আরও কৌশলগত ও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। একটি যৌথ বিবৃতিতে অংশগ্রহণকারীরা রাশিয়াকে সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথাও উল্লেখ করেন।
ওই বৈঠকে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস বলেছিলেন, ‘সুদূর উত্তর, কম মনোযোগ’ — সেই যুগ শেষ হয়ে গেছে। ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পেত্তেরি ওরপো রাশিয়াকে সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি হুমকি আখ্যা দিয়ে বলেন, আর্কটিককে কৌশলগত সীমান্ত হিসেবে দেখতেই হবে ইইউকে।
তবে নিরাপত্তায় জোর দিলেও জলবায়ু প্রশ্নে নিজের পুরনো অবস্থান ধরে রেখেছে কমিশন। ইইউর অবস্থান আগের মতোই — আর্কটিকসহ সব জায়গায় তেল, কয়লা ও গ্যাস মাটির নিচেই থেকে যাওয়া উচিত। একই সঙ্গে জলবায়ু গবেষণা, পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কমিশন, আর্কটিকের বাসিন্দাদের সঙ্গে মিলেই এই কাজ করার কথা বলা হয়েছে।




