৪৩ বছর পর সিএনএন ছাড়ছেন ক্রিশ্চিয়ান আমানপুর, বিদায় আগামী বছর
টানা চার দশকেরও বেশি সময় যুক্ত থাকার পর যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএন ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান আন্তর্জাতিক অ্যাঙ্কর ও জ্যেষ্ঠ যুদ্ধ সংবাদদাতা ক্রিশ্চিয়ান আমানপুর। দীর্ঘ ৪৩ বছরের বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের পর আগামী বছর তিনি সিএনএন থেকে বিদায় নেবেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
এক বিবৃতিতে ৬৮ বছর বয়সি এই বর্ষীয়ান সাংবাদিক বলেন, ‘বহু মাসের ভাবনাচিন্তা এবং বেশ কিছু নির্ঘুম রাতের পর আমি সিএনএন থেকে আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। গত ৪৩টি চমৎকার বছর ধরে এটি আমার সঙ্গী ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘সামনে নতুন ও আকর্ষণীয় কিছু কাজের জন্য আমি মুখিয়ে আছি। সিএনএনের স্বাধীন সাংবাদিকতার যে ইতিহাস, তার জন্য আমি সব সময় শুভকামনা জানিয়ে যাব। তবে মনে রাখবেন, সবসময় সত্যনিষ্ঠ হোন, কেবল নিরপেক্ষ নয়।’
সিএনএনের চেয়ারম্যান মার্ক থম্পসন গত সোমবার কর্মীদের কাছে পাঠানো এক স্মারকপত্রে আমানপুরকে বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের ‘অন্যতম বিশ্বস্ত ও জনপ্রিয় সাংবাদিক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
থম্পসন লেখেন, ক্রিশ্চিয়ান অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমরা বিগত কয়েক মাস ধরে এটি নিয়ে আলোচনা করছিলাম। আজকের এই খবরে সিএনএনের অনেকের মতো আমিও অত্যন্ত ব্যথিত। তবে ব্যক্তিগত ও পেশাগত দিক থেকে এটি যে তার জন্য সঠিক সময়, তা আমি মেনে নিয়েছি।
তিনি আরও যোগ করেন, পুরো সিএনএন নেতৃত্ব দলের পক্ষ থেকে আমি ক্রিশ্চিয়ানকে তার ৪৩ বছরের অসাধারণ সাংবাদিকতা, নিষ্ঠা ও বন্ধুত্বের জন্য ধন্যবাদ জানাই। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, আগামী বছর বিদায় নেওয়ার আগে এই কিংবদন্তি সাংবাদিকের ক্যারিয়ার উদ্যাপনে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ক্রিশ্চিয়ান আমানপুর ১৯৮৩ সালে সিএনএনের আন্তর্জাতিক ডেস্কের একজন সাধারণ সহকারী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সংঘাত, যুদ্ধ ও সংকটময় পরিস্থিতির সরাসরি চিত্র তুলে ধরে তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান।
নিজের বিদায়ী বার্তায় সহকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আমানপুর বলেন, ‘আমার প্রথম বড় ও রোমাঞ্চকর অ্যাসাইনমেন্ট ছিল প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ। সেখান থেকে শুরু করে বসনিয়া যুদ্ধ, রুয়ান্ডা, আফগানিস্তান, ইউক্রেন ও ইরানের মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের ভয়াল দৃশ্যপট কভার করার সুযোগ পেয়েছি।’
তিনি মাঠপর্যায়ের কাজের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘সব সময় আমাদের লক্ষ্য ছিল সত্য, প্রমাণ ও মানবতাকে খুঁজে বের করা; যাতে সিএনএন কোনো ভয় বা পক্ষপাত ছাড়া বিশ্বের কাছে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য পৌঁছে দিতে পারে।’
উল্লেখ্য, ২০০৯ সাল থেকে সিএনএন ইন্টারন্যাশনালে নিজের নামে সান্ধ্যকালীন আন্তর্জাতিক সাক্ষাৎকারভিত্তিক জনপ্রিয় অনুষ্ঠান পরিচালনা করে আসছিলেন এই সাংবাদিক। বিশ্বনেতা ও সিদ্ধান্তগ্রহণকারীদের মুখোমুখি প্রশ্নের জন্য সেই অনুষ্ঠানটি আলাদা পরিচিতি পেয়েছিল।
বাংলাদেশের দর্শকদের কাছেও আমানপুর পরিচিত মুখ। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কর ফাঁকির মামলায় নানাভাবে হয়রানির শিকার নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার কন্যা অপেরা শিল্পী মনিকার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন তিনি। এ ছাড়া কক্সবাজার আশ্রয়শিবিরে রোহিঙ্গাদের মানবেতর জীবনযাপন নিয়েও প্রতিবেদন করেছেন তিনি।
চার দশকের বেশি সময় ধরে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরাসরি প্রতিবেদন করে আমানপুর আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার সবচেয়ে পরিচিত মুখগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছিলেন। তার বিদায়ের ঘোষণায় তাই সিএনএনের ভেতরে-বাইরে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
আগামী বছর আনুষ্ঠানিক বিদায়ের আগে তিনি দায়িত্ব পালন করে যাবেন। বিদায়ের পর তার পরবর্তী গন্তব্য কী হবে, তা এখনো জানা যায়নি; তবে নিজের বিবৃতিতে ‘নতুন ও আকর্ষণীয় কাজের’ ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন তিনি।




