দখলমুক্ত ভুলতা-গাউছিয়ার ফুটপাত: উচ্ছেদের পর বদলে গেছে চিত্র, নজরদারি নিয়ে শঙ্কা
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভুলতা-গাউছিয়া সড়ক থেকে হকার উচ্ছেদের পর পাল্টে গেছে এলাকার চিরচেনা চিত্র। একসময় চার লেনের সড়কের একাধিক লেন ও ফুটপাত দখল করে কাঁচাবাজারসহ নিত্যপণ্যের দোকানপাট বসত; এখন সেই দোকানগুলো আর নেই, নেই আগের সেই কোলাহলও।
ফুটপাত ও সড়ক থেকে হকার উচ্ছেদের পর রূপগঞ্জের ভুলতা-গাউছিয়া, রূপসী, মুড়াপাড়া ও কাঞ্চন এলাকার চিত্রও বদলে গেছে। সড়কের পাশে এখন শুধু সিএনজি, রিকশা ও অটোরিকশা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে; যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনার স্তূপও আর চোখে পড়ছে না।
জানা গেছে, ঐতিহ্যবাহী গাউছিয়া মার্কেটের কারণে এই সড়কটি ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। প্রায় দুই বছর ধরে গোলাকান্দাইল মজিদ প্লাজা থেকে ভুলতার রেদোয়ান টাওয়ার পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার সড়কের ফুটপাত ও মূল সড়কের ওপর গড়ে ওঠা অবৈধ দোকানপাটের কারণে পথচারীদের সড়ক দিয়ে চলাচল করতে চরম কষ্ট হতো।
গত ১৩ অক্টোবর ভুলতা-গাউছিয়াসহ আশপাশের এলাকায় অবৈধ স্থাপনা ও হকারদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। এর ফলে দীর্ঘদিনের দখলে থাকা সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত হয়েছে। এলাকাবাসীর ভাষ্য, পকেটমার, মলমপার্টি ও ছিনতাইকারীদের উপদ্রবও এখন আর নেই।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ভুলতা ফ্লাইওভারের আসা-যাওয়ার এলাকা সাওঘাট, এশিয়ান হাইওয়ে সড়ক, রূপসী, মুড়াপাড়া ও কাঞ্চনসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কের উভয় পাশের ফুটপাত ও সড়কে গড়ে ওঠা পাঁচ শতাধিক অবৈধ দোকানপাট ও স্থাপনা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অস্থায়ী দোকান উচ্ছেদ হওয়ায় চিরচেনা তীব্র যানজট ও জনজটও কিছুটা কমে এসেছে; পথচারী ও যানবাহন চলাচলে ফিরেছে স্বস্তি।
১৪ অক্টোবর গোলাকান্দাইলের সাওঘাটে আবারও অভিযান পরিচালনা করা হয়। ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের উদ্যোগে রূপগঞ্জ থানা ও ট্রাফিক বিভাগ নিয়মিত বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে। ১৭ অক্টোবর সকালে কাঞ্চন পৌরসভার নেতৃত্বে কাঞ্চন বাজারেও যৌথ উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে ফুটপাত দখলমুক্ত করা হয়; এসব অভিযানে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন।
রূপগঞ্জ থানা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহফুজুর রহমান হুমায়ুন বলেন, ‘যারা চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত, তাদের পরিচয় একটাই—তারা চাঁদাবাজ। কারো নাম, পরিচয় বা প্রভাব ব্যবহার করে কোনো ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ নেই।’ তিনি আরও বলেন, উচ্ছেদের পর তারা কয়েক দফা সরেজমিনে পরিদর্শন ও মনিটরিং করেছেন এবং জনস্বার্থে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন স্থানে নিজ উদ্যোগে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে; পাশাপাশি এলাকার পরিবেশ সুন্দর ও সবুজ রাখতে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে।
ভুলতা ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম আরিফ বলেন, ‘আমাদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে রাস্তার পাশে থাকা ভবন বা জায়গার মালিকদের একটি অংশ অবৈধভাবে হকার বসানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। অবৈধ হকারদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা বা অগ্রিম অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। আবার কোথাও কোথাও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে এসব কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়।’
তবে এলাকাবাসীর মধ্যে শঙ্কাও কাজ করছে। তাদের ভাষ্য, কঠোর নজরদারি না থাকলে হয়তো আবারও ফুটপাত দখল করে দোকান বসতে পারে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, হকার ও ভাসমান অপরাধীদের জন্য এই এলাকা চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছিল; উচ্ছেদের কারণে অনেকটাই রেহাই মিলেছে—এখন দেখতে হবে এই সুন্দর পরিবেশ কত দিন টিকে।
মঞ্জু নামের এক পথচারী বলেন, হকাররা রাস্তা পর্যন্ত দখল করে রেখেছিল, সেখান থেকে পথচারীরা উদ্ধার পেয়েছেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের সদিচ্ছা থাকলে পুরো রূপগঞ্জ উপজেলাকেই সুন্দর করা সম্ভব।
এদিকে উচ্ছেদ হওয়া হকারদের কথাও ভাবা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দীপুর উদ্যোগে গাউছিয়া মার্কেটের পশ্চিম পাশে সিংলাব সড়কের বালুর মাঠে হকারদের দোকান বসানোর স্থান করে দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে যে কেউ উন্মুক্ত জায়গায় ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন, কোনো প্রকার টাকা দিতে হবে না।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ভুলতা ইউনিয়নের যুবদলের কর্মী ও প্রশাসনের লোকজনের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। তবে সচেতন মহল মনে করছে, এই নজরদারি ধারাবাহিকভাবে ধরে রাখা না গেলে দখলদাররা আবার ফিরে আসতে পারে—সে কারণেই উচ্ছেদের সুফল টেকসই করতে নিয়মিত তদারকির বিকল্প নেই বলে মত তাদের।




