পাঁচ বিঘার পেয়ারা থেকে ৭০ বিঘার মিশ্র ফলের বাগান, কুষ্টিয়ায় পিতা-পুত্রের সাফল্য
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলায় ৭০ বিঘা জমিতে মিশ্র ফলের বাগান গড়ে সাফল্যের মুখ দেখছেন হযরত আলী ও তাঁর ছেলে রাসেল হোসেন। একসময়ের ছোট্ট পেয়ারার বাগানই আজ এলাকার মানুষের কাছে আধুনিক ফলচাষের বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
ভেড়ামারা উপজেলার মোকারিমপুর ইউনিয়নের ফকিরাবাদ আওড়ের বিলের মাঠের ব্রিজসংলগ্ন কৃষিজমিতে ২০১৪ সালে পিতা-পুত্র মিলে এই মিশ্র ফলের বাগান ও নার্সারি গড়ে তোলেন। শুরুটা ছিল মাত্র পাঁচ বিঘার পেয়ারার বাগান দিয়ে।
পরিকল্পিত পরিচর্যা, আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই বাগান সম্প্রসারিত হয়েছে ৭০ বিঘায়। বর্তমানে এই বাগানে উৎপাদিত বিভিন্ন জাতের ফল স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণ করছে।
বর্তমানে ৭০ বিঘার বাগানের ৩০ বিঘাতে উন্নত জাতের পেয়ারা, মাল্টা, কমলা, ড্রাগন ফল, কলা, আঙুর, বরই, সফেদা, স্ট্রবেরি ও লেবুসহ বিভিন্ন ধরনের ফলের চাষ হচ্ছে। একটি ফসলের ওপর নির্ভর না করে নানা জাতের ফল একসঙ্গে চাষ করাই এই বাগানের মূল পরিকল্পনা।
ইন্টারনেটে কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন ভিডিও দেখে আধুনিক ফলচাষ, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, সেচ ও সার প্রয়োগের বিভিন্ন কৌশল শিখে সেগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করতে শুরু করেন তাঁরা। সেই শেখা জ্ঞানই বাগানের উৎপাদন ধীরে ধীরে বাড়িয়ে দিয়েছে।
ছেলে মো. রাসেল হোসেন জানান, সমন্বিত বাগানের প্রতিটি গাছ নিয়মিত ছাঁটাই, সুষম সার প্রয়োগ, সেচ ব্যবস্থাপনা এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিচর্যা করা হয়। এর ফলে ফলের উৎপাদন যেমন বেড়েছে, তেমনি গুণগত মানও উন্নত হয়েছে।
চলতি মৌসুমে অনুকূল আবহাওয়া এবং আধুনিক পরিচর্যার কারণে পেয়ারার ফলন আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি হয়েছে। আকারে বড়, স্বাদে মিষ্টি ও মানসম্মত হওয়ায় বাজারে এসব পেয়ারার ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে।
পিতা হযরত আলী জানান, বর্তমানে পাইকারি ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে সাধারণ ক্রেতারাও সরাসরি বাগানে এসে গাছ থেকে পছন্দমতো ফল সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে ক্রেতারা তাজা ও নিরাপদ ফল পাচ্ছেন, আর মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন উদ্যোক্তারা।
প্রতি মণ পেয়ারা ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে বলে জানা গেছে। সরাসরি বিক্রির এই ব্যবস্থা বাগানের আয়কে আরও স্থিতিশীল করেছে।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, হযরত আলী ও তাঁর ছেলে রাসেলের এমন সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে তাঁরাও এখন আধুনিক ও লাভজনক এই মিশ্র কৃষিপদ্ধতিতে চাষাবাদ করার আগ্রহ প্রকাশ করছেন। তাঁদের দেখে কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হওয়ার লক্ষ্যে অনেক তরুণ এখন আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ফলচাষে ঝুঁকছেন।
ভেড়ামারার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম জানান, তরুণ উদ্যোক্তাদের কৃষিতে আগ্রহী করে তুলতে কৃষি বিভাগ নানা সহযোগিতা করছে। তাঁর মতে, পিতা-পুত্রের এই উদ্যোগ দেখিয়ে দিয়েছে, আধুনিক প্রযুক্তি, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও কঠোর পরিশ্রমের সমন্বয় ঘটাতে পারলে কৃষিও হতে পারে লাভজনক ও সম্মানজনক পেশা।
নিজের মাটিতে সফল হওয়ার যে সম্ভাবনা রয়েছে, হযরত আলী ও রাসেল হোসেনের এই বাগান তারই বাস্তব প্রতিচ্ছবি। আগামী মৌসুমগুলোতে এই সাফল্য এলাকার আরও কৃষককে মিশ্র ফলচাষে টেনে আনবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।





