চীনকে ‘বুদ্ধিতে হারাতে’ নৌবাহিনীর রোবট চুক্তির সীমা চার গুণ বাড়িয়ে ৩০ কোটি ডলার করল যুক্তরাষ্ট্র
মার্কিন নৌবাহিনী যুদ্ধজাহাজ পরিদর্শনে ব্যবহৃত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত রোবটের একটি চুক্তির সীমা চার গুণ বাড়িয়ে ৩০ কোটি ডলারে উন্নীত করেছে। জাহাজগুলোকে দ্রুত রক্ষণাবেক্ষণ শেষ করে আবার সাগরে ফেরানোর লক্ষ্যেই এই সম্প্রসারণ।
মাত্র ছয় মাস আগে প্রযুক্তিটি প্রথম কাজে লাগানোর পর সম্প্রসারিত এই চুক্তি পিটসবার্গভিত্তিক গেকো রোবোটিকসের সঙ্গে করা হয়েছে। চুক্তির প্রাথমিক সীমা ছিল ৭ কোটি ১০ লাখ ডলার। চীনের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান জাহাজ নির্মাণ ব্যবধানের মধ্যে নৌবহরের প্রস্তুতি বাড়াতে চাইছে নৌবাহিনী।
গেকো রোবোটিকসের প্রধান নির্বাহী জেক লুসারারিয়ান বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র হয়তো চীনের চেয়ে দ্রুত উৎপাদনে এগিয়ে যেতে পারবে না, কিন্তু আমরা যেভাবে আমাদের জাহাজগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করি, পরিচালনা করি এবং প্রস্তুত রাখি, সেভাবে বুদ্ধিতে এগিয়ে যেতে পারি।’
গেকোর দাবি, তাদের প্রযুক্তি একটি জাহাজে মেরামত খরচে ৮০ লাখ ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারে এবং কিছু কাঠামোগত সমস্যা প্রচলিত পরিদর্শন পদ্ধতির তুলনায় ৫০ গুণ পর্যন্ত দ্রুত শনাক্ত করতে পারে।
কোম্পানিটি নৌবাহিনীর জন্য বিশেষভাবে তৈরি নতুন একটি রোবটও উন্মোচন করেছে, যার নাম কোমোডো। এই রোবট যুদ্ধজাহাজের ডেকের পুরু আবরণ না সরিয়েই তার নিচের ইস্পাত পরিদর্শন করতে পারে।
কোমোডো জাহাজের ডেক স্ক্যান করে ক্ষয় ও উপাদানের পুরুত্বের মানচিত্র তৈরি করে। ফলে বড় ধরনের কাজ শুরু করার আগেই রক্ষণাবেক্ষণ দল বুঝতে পারে কোথায় মেরামত দরকার।
লুসারারিয়ান বলেন, ‘এটি মূলত একটি ক্যাট স্ক্যান। আপনি ঠিক বুঝতে পারছেন ভেতরে কী ঘটছে।’ প্রচলিত পদ্ধতিতে জাহাজের নন-স্কিড ডেক আবরণের নিচের ইস্পাতের অবস্থা জানতে হলে আগে উপাদান সরাতে হতো, সমস্যার মাত্রা না জেনেই।
তিনি আরও বলেন, রোবটগুলো জাহাজকে খুলে না ফেলেই বুঝতে পারে কোথায় সমস্যা। একটি উদাহরণে তিনি জানান, প্রাথমিক মূল্যায়নে প্রায় ১,২০০ বর্গফুট মেরামতের কথা বলা হলেও রোবট পরিদর্শনের পর তা কমে প্রায় ৩০০ বর্গফুটে নেমে আসে।
বর্ধিত সীমাটি এসেছে নৌবাহিনী গেকোকে পাঁচ বছর মেয়াদি ৭ কোটি ১০ লাখ ডলারের চুক্তি কাঠামো দেওয়ার মাত্র ছয় মাস পর। মার্চে ঘোষিত প্রাথমিক চুক্তির আওতায় গেকোর কাজ শুরু করার কথা ছিল মার্কিন প্যাসিফিক ফ্লিটের ১৮টি জাহাজে, যার মধ্যে রয়েছে ডেস্ট্রয়ার, উভচর যুদ্ধজাহাজ ও লিটোরাল কমব্যাট শিপ।
কোম্পানির দেয়াল বেয়ে ওঠা রোবটগুলো জাহাজের খোল, ফ্লাইট ডেক, ব্যালাস্ট ট্যাংকসহ দুর্গম এলাকায় ঘুরে ক্ষয়, ধাতু ক্ষয় ও অন্যান্য কাঠামোগত সমস্যা খোঁজে। সংগৃহীত তথ্য গেকোর এআইচালিত ক্যান্টিলিভার প্ল্যাটফর্মে পাঠানো হয়, যাতে রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনাকারীরা ঠিক করতে পারেন কোথায় মেরামত দরকার।
লক্ষ্য হলো সমস্যাগুলো আগেভাগে ধরা, যাতে জাহাজ বড় রক্ষণাবেক্ষণ পর্বে ঢোকার পর অতিরিক্ত কাজ বেরিয়ে এসে শিপইয়ার্ডে থাকার সময় বাড়িয়ে না দেয়। লুসারারিয়ানের ভাষায়, ‘সবচেয়ে বড় সাশ্রয় হলো গতিতে। গতির কোনো মূল্য হয় না, বিশেষ করে আপনি যদি এখন মার্কিন নৌবাহিনীতে থাকেন।’
এই সম্প্রসারণ এমন সময়ে এল যখন নৌবাহিনীর নেতারা নৌবহরের প্রস্তুতি ৮০ শতাংশের দিকে নিতে চাইছেন, অথচ রক্ষণাবেক্ষণ বিলম্বে অনেক জাহাজ মোতায়েনের বাইরে পড়ে থাকছে। চীনের যুদ্ধ নৌবহর ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বড় এবং তারা এমন গতিতে জাহাজ তৈরি করতে পারে, যা মার্কিন শিপইয়ার্ডগুলোর পক্ষে সহজে ধরা কঠিন।
গেকোর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো বিদ্যমান ক্ষতি খোঁজার বাইরে গিয়ে বছরের পর বছর ধরে জমা পরিদর্শন তথ্য ব্যবহার করে সমস্যা আগাম অনুমান করা। লুসারারিয়ান বলেন, ‘আপনি ঠিক অনুমান করতে পারবেন কোনটি ভাঙার আগেই ভাঙতে যাচ্ছে’, ফলে জাহাজ ঘাটে বা শিপইয়ার্ডে পৌঁছানোর সময় শ্রমিক, উপকরণ ও মেরামত পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখা যাবে।
প্রযুক্তিটি শিপইয়ার্ড শ্রমিকদের বিপজ্জনক ও শ্রমসাপেক্ষ পরিদর্শন কাজও কমাতে পারে, এমন সময়ে যখন শিল্প খাতটি দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতিতে ভুগছে। লুসারারিয়ানের মতে, রোবোটিকস ও এআইয়ের সমন্বয়ের লক্ষ্য হলো সীমিত জনবল যাতে কী মেরামত দরকার তা খুঁজতে কম সময় ব্যয় করে জাহাজ সারাতে বেশি সময় দিতে পারে।






