স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগপত্র ফিরিয়ে দিলেন ম্যাক্রোঁ, সহিংসতায় কাঁপছে ফ্রান্সের বাজারও
ফ্রান্সজুড়ে দাঙ্গা ও সহিংসতার মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন নুনিয়াজের পদত্যাগপত্র প্রত্যাখ্যান করেছেন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। সংকট সামলাতে নিরাপত্তা বাহিনীর নেতৃত্বে ধারাবাহিকতা জরুরি — এই যুক্তিতেই মন্ত্রীকে পদে বহাল রেখেছেন তিনি, যদিও ব্যর্থতার কথা নিজেই স্বীকার করেছেন।
সোমবার ফরাসি প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এলিসি প্যালেসের বিবৃতিতে জানানো হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে নির্দেশনার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে নুনিয়াজের থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ত্রুটি নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং এ ধরনের সংকট আরও কার্যকরভাবে মোকাবিলায় নতুন অপারেশনাল পদ্ধতি চালুর নির্দেশ দিয়েছেন ম্যাক্রোঁ।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সংকট আরও খারাপ হওয়ার পেছনে আগাম ধারণা ও গোয়েন্দা তথ্যের ক্ষেত্রে ব্যর্থতা ছিল বলে ম্যাক্রোঁ নিজেই উল্লেখ করেছেন। তার পরও মন্ত্রীকে সরানোর পথে যাননি তিনি।
শনিবার ছিল সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সহিংস দিনগুলোর একটি। সেদিন ফ্রান্সে প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার বিক্ষোভকারী রাস্তায় নেমে আসেন। অধিকাংশ বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ হলেও বিভিন্ন শহরে তা সহিংসতায় রূপ নেয়।
ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় ও জনসেবার অবনতির প্রতিবাদে চলা এই বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৩৯৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া ৯৯৭ জন পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে সাতজনের অবস্থা গুরুতর।
শনিবার রাজধানী প্যারিস, মার্সেই, লিয়ন, বর্ডো ও লিমোজের মতো প্রধান শহরগুলোতে বিক্ষোভ সহিংস হয়ে ওঠে। লিমোজে মুখোশধারীদের হামলায় ঐতিহাসিক টাউন হল পুড়ে যায়। মার্সেই ও লিমেতে পৌর ভবনে হামলার পাশাপাশি বর্ডোতে জেলা প্রশাসকের বাসভবনে ভাঙচুর চালানো হয়। একদল দাঙ্গাকারী প্রেসিডেন্ট ভবন এলিসি প্যালেসের আশপাশে পৌঁছে যাওয়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও বড় প্রশ্ন ওঠে।
একাধিক টাউন হলে আগুন দেওয়া হয়, আর শত শত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট বা ভাঙচুর চালানো হয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জ্বালানির অগ্নিমূল্য থেকে তৈরি জনঅসন্তোষই এই দাঙ্গার পেছনের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
পুলিশি অভিযানের প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে নানা দিক থেকে সমালোচনা শুরু হয়েছে। গ্রিন পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মারিন টন্ডেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে বলেন, তিনি সংকটের মাত্রা বুঝতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। ফ্রান্স আনবাউড ও ন্যাশনাল র্যালি দলের পক্ষ থেকেও সরকারের অদক্ষতার অভিযোগ তোলা হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ মন্তব্য করেন, রাষ্ট্র দেশজুড়ে জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
অন্যদিকে সোমবার এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে নুনিয়াজ স্বীকার করেন, বিক্ষোভের সময় কিছু শহরে পুলিশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল। তবে অপর্যাপ্ত পরিকল্পনার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীকে এমন একদল সুপরিকল্পিত মানুষের মুখোমুখি হতে হয়েছে, যারা আকস্মিক হামলা চালিয়ে দ্রুত ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার কৌশল নিয়েছিল।
রবিবার রাতে টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণে ম্যাক্রোঁ এই সহিংসতাকে বাঁধভাঙা সহিংসতা বলে নিন্দা করেন। তিনি বলেন, এই ছবিগুলো দেখে সবাই নিজেদের প্রশ্ন করেছেন — তাদের মনে কী চলছে? ফরাসিরা ফ্রান্সের সঙ্গে এমন করতে পারে কীভাবে?
একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী ও ধ্বংসযজ্ঞে জড়িতদের আলাদা করে দেখার কথা বলেন তিনি। তরুণদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে আস্থার সংকট দূর করার প্রতিশ্রুতিও দেন ম্যাক্রোঁ। সামনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় শান্তি ও ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।
সহিংসতার ধাক্কা লেগেছে ফ্রান্সের অর্থবাজারেও। সোমবার ফরাসি সরকারি ঋণের বন্ড ও শেয়ারবাজারে নতুন করে বিক্রির চাপ দেখা দেয়। ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড সাত বেসিস পয়েন্ট বেড়ে ৪.৮৪৯ শতাংশে পৌঁছায়। ইল্ড বাড়া মানে বন্ডের দাম কমা, আর এতে ফরাসি ও জার্মান ১০ বছর মেয়াদি ঋণের খরচের ব্যবধান আরও বেড়েছে।
দুই বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড ২.৫ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে ৩.৫৭১ শতাংশ হয়, আর ৩০ বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড তিন বেসিস পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়ায় ৫.৩৯৭ শতাংশে। প্যারিসের শেয়ারবাজার ক্যাক ৪০ সূচক দিনের শুরুতে ১ শতাংশ কমে যায়। ডলারের বিপরীতে ইউরোও সামান্য কমে ১.১২২ ডলারে নামে।
ডয়চে ব্যাংকের জিম রিড বলেন, এই বিক্ষোভ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য ফরাসি সরকারি বন্ড কেনার ক্ষেত্রে স্বস্তি পাওয়াকে সহজ করবে না। তাঁর মতে, ফ্রান্সের কঠিন রাজস্ব পরিস্থিতি ও ২০২৭ সালের নির্বাচন সামনে থাকায় এই সপ্তাহান্ত রাজনৈতিক ঝুঁকির আরেকটি স্তর যোগ করেছে।
ঋণের খরচ বাড়লে ফ্রান্সের সরকারি অর্থায়নে আরও চাপ পড়বে। সরকার আগামী বছরের বাজেট পাস করে ঘাটতি কমানোর চেষ্টা করছে, যেখানে প্রতিরক্ষা ছাড়া বিভিন্ন বিভাগে পেনশন ও বরাদ্দ কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক চাপে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা বাড়ছে।
এদিকে জ্বালানির দাম কমাতে ও তেল-ডিজেল সরবরাহের নতুন চুক্তি নিশ্চিত করতে সোমবার থেকে চার দিনের উপসাগরীয় সফর শুরু করেছেন ম্যাক্রোঁ। ১৯ থেকে ২১ অক্টোবর তিনি কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কাতার সফর করবেন। হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে ভূরাজনৈতিক সংকটে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ফ্রান্সে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে বলে খবরে বলা হয়েছে।






