শহীদ পরিবারের অনুষ্ঠানে বিরোধী নেতাদের অনুপস্থিতি অবজ্ঞার শামিল, বললেন প্রধানমন্ত্রী
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়েও বিরোধী দলের নেতাদের অনুপস্থিতিকে শহীদ পরিবারের প্রতি অবজ্ঞার শামিল বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার সকালে রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একই অনুষ্ঠানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত ওসমানী উদ্যানও আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী পাঁচ বছর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব কার হাতে থাকবে, তা দেশের সচেতন জনগণ ভোটের মাধ্যমে নির্ধারণ করেছে। সেই রায়ের ফলেই বিএনপি আজ রাষ্ট্রক্ষমতায় এবং অন্য দল বিরোধী দলের আসনে বসেছে। তার ভাষায়, ক্ষমতা ও বিরোধী আসন — দুটোই জনগণের রায়ের ফল, কোনো পক্ষের অনুগ্রহ নয়।
বিরোধী দলের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করার পূর্ণ অধিকার তাদের রয়েছে এবং তা হওয়া উচিত বাস্তবসম্মত। কিন্তু বর্তমান বিরোধী দল কেবল অন্ধভাবে বিরোধিতার খাতিরেই সরকারের বিরোধিতা করে যাচ্ছে বলে তিনি সমালোচনা করেন। গঠনমূলক সমালোচনা ও অন্ধ বিরোধিতার মধ্যে পার্থক্য টেনেই তিনি তার বক্তব্য সাজান।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, এই রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতারা কখনোই অন্তরে জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করতে পারেন না। সে কারণেই আমন্ত্রণপত্র পাওয়ার পরও বিরোধীদলীয় নেতা এই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে অংশ নেননি। অনুপস্থিতিকে তিনি জুলাইয়ের চেতনা ধারণ না করার প্রমাণ হিসেবেই তুলে ধরেন।
বিরোধী দলের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, শাসক দলের সঙ্গে একই মঞ্চে আসন গ্রহণে যদি তাদের কোনো নীতিগত আপত্তি বা অনীহা থেকেই থাকে, তবে তারা চাইলে সরাসরি শহীদ পরিবারের সদস্য ও প্রিয়জনদের সঙ্গেও একত্রে বসতে পারতেন। অর্থাৎ সরকারের সঙ্গে মঞ্চ ভাগ না করলেও শহীদ পরিবারের পাশে বসার বিকল্প ছিল — এই যুক্তিই তিনি সামনে আনেন।
জাতীয় নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভোটের আগে বর্তমান বিরোধী দল ও তাদের প্রার্থীরা নিশ্চয়ই দেশের সাধারণ ভোটারের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে নিজেদের পক্ষে রায় চেয়েছিল, যেমনটি তার দলও গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত জনগণই স্বতঃস্ফূর্তভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আগামী পাঁচ বছর কারা রাষ্ট্র পরিচালনা করবে।
সেই জনরায়ের মাধ্যমেই বিএনপিকে সরকারে বসানো হয়েছে এবং অপর দলকে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ফলে বিরোধী দলের বর্তমান অবস্থানও জনগণের সিদ্ধান্তেরই অংশ — এই বাস্তবতা মেনে জাতীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া উচিত ছিল বলে তার বক্তব্যে ইঙ্গিত মেলে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আবদুল মঈন খান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের এই উপস্থিতি অনুষ্ঠানটির জাতীয় গুরুত্বকেই তুলে ধরে।
অনুষ্ঠানটির কেন্দ্রে ছিল সদ্য নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ এবং শহীদ পরিবারের সদস্যরা। ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যানে আয়োজিত এই উদ্বোধনকে প্রধানমন্ত্রী ‘ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান’ হিসেবে বর্ণনা করেন। শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণের এই আয়োজনই ছিল দিনের মূল কর্মসূচি, যার মঞ্চ থেকে রাজনৈতিক বার্তাগুলো এসেছে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল সুর ছিল দুটি — জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা এবং জুলাইয়ের চেতনার প্রশ্নে বিরোধী দলের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন। তার মতে, যারা জনগণের কাছেই ভোট চেয়েছিল, তাদের পক্ষে জনগণের রায়ে গঠিত জাতীয় অনুষ্ঠান থেকে দূরে থাকা যুক্তিযুক্ত নয়।
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এই অনুপস্থিতি নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা এই প্রতিবেদনের উপাদানে নেই। ফলে প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগের জবাব কী হবে, তা এখনো জানা যায়নি। রাজনৈতিক অঙ্গনে এই বক্তব্য নিয়ে পাল্টা প্রতিক্রিয়া আসে কি না, সেদিকে নজর থাকবে।
স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধনের দিনে দেওয়া এই বক্তব্য জুলাইয়ের চেতনা, সংসদীয় রাজনীতি ও সরকার-বিরোধী সম্পর্ক নিয়ে চলমান বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে। এখন দেখার বিষয়, বিরোধী দল এই সমালোচনার কী জবাব দেয় এবং ভবিষ্যতে জাতীয় অনুষ্ঠানগুলোতে সব পক্ষের অংশগ্রহণের পরিবেশ তৈরি হয় কি না।




