জনস্বার্থে শেয়ারের পাঁচ শতাংশ: আইপিওর আগে অ্যানথ্রপিকের বড় ঘোষণা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক তার শেয়ারের পাঁচ শতাংশ একটি পাবলিক বেনিফিট ফান্ডের জন্য বরাদ্দ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জনস্বার্থে কাজ করার লক্ষ্যে গঠিত এই তহবিলের মাধ্যমে কোম্পানির সম্পদের একটি অংশ সরাসরি জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহারের পথ তৈরি হলো। সম্ভাব্য আইপিওর আগে নেওয়া এই সিদ্ধান্তকে কোম্পানিটির ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঘোষণা অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে পাঁচ শতাংশ শেয়ার এই তহবিলে যাবে। তবে এখানেই শেষ নয়। কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ চাইলে পরবর্তী সময়ে আরও দুই শতাংশ শেয়ার এই তহবিলে যোগ করতে পারবে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে জনস্বার্থের জন্য বরাদ্দ শেয়ারের পরিমাণ সাত শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
তহবিলের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট সীমা টেনে দেওয়া হয়েছে। এই শেয়ার থেকে পাওয়া অর্থ লবিং বা রাজনৈতিক অনুদানের কাজে ব্যবহার করা যাবে না। ফলে তহবিলটি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার না হয়ে জনকল্যাণমূলক উদ্দেশ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে ঘোষণায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
এই ঘোষণা এসেছে এমন এক সময়ে, যখন অ্যানথ্রপিকের সম্ভাব্য আইপিও নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে। আইপিও হলে কোম্পানিটির মূল্য এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এত বড় মূল্যায়নের একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে শেয়ারের একটি অংশ জনস্বার্থে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বাজারে ব্যাপক মনোযোগ কেড়েছে।
আইপিও সংক্রান্ত নথিতে অ্যানথ্রপিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি নিয়েও সতর্কবার্তা দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এআই মানবজাতির জন্য বিপর্যয়কর বা অস্তিত্বসংকট তৈরি করতে পারে এমন ঝুঁকি বহন করতে পারে। নিজেদের প্রযুক্তির সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে এতটা খোলামেলা ভাষা একটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিরল।
ঝুঁকির কথা বলার পাশাপাশি কোম্পানিটির ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির চিত্রও চমকপ্রদ। সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত তিন মাসে অ্যানথ্রপিকের আয় বেড়েছে ৪৫ শতাংশ, পৌঁছেছে ১৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে। দ্রুত বাড়তে থাকা এই আয় দেখায়, বাজারে কোম্পানিটির পণ্য ও সেবার চাহিদা কত দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে।
পাবলিক বেনিফিট ফান্ডের অর্থ কোথায় খরচ হতে পারে, সে সম্পর্কেও ধারণা দেওয়া হয়েছে। এই তহবিল অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে চাকরির বাজারে যে প্রভাব পড়ছে, সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়ও তহবিলের অর্থ ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।
চাকরি নিয়ে উদ্বেগের পেছনে রয়েছে বড় একটি প্রেক্ষাপট। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ২০২৪ সালের গবেষণায় বলা হয়েছিল, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪০ শতাংশ চাকরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে প্রভাবিত হবে। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে এই হার ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। সেই হিসাব সামনে রেখেই চাকরির ওপর এআইয়ের প্রভাব মোকাবিলা তহবিলের অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে।
ঘোষণার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক। তিনি শেয়ার সরাসরি জনগণের হাতে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। অর্থাৎ তহবিলের মাধ্যমে না দিয়ে সাধারণ মানুষকে সরাসরি মালিকানার অংশীদার করার পক্ষে মত দিয়েছেন তিনি। তার এই মন্তব্য আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি এখন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। একদিকে অ্যানথ্রপিক একটি নির্দিষ্ট তহবিলের মাধ্যমে অলাভজনক কাজ ও চাকরির প্রভাব মোকাবিলায় অর্থ ব্যয়ের কাঠামো তৈরি করছে। অন্যদিকে মাস্কের প্রস্তাব হলো, সেই সম্পদের মালিকানা সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কোন পথ বেশি কার্যকর হবে, তা নিয়ে বিতর্ক চলছে।
বিশ্লেষণের জায়গা থেকে দেখলে, এই সিদ্ধান্তের বার্তা শুধু অর্থের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যায়নের দিকে এগোতে থাকা একটি কোম্পানি যখন নিজের প্রযুক্তির অস্তিত্বগত ঝুঁকির কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করে এবং একই সঙ্গে আয়ের একটি অংশ জনস্বার্থে রাখার কথা বলে, তখন তা পুরো এআই শিল্পের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এখন সবার নজর থাকবে পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। আইপিও প্রক্রিয়া কত দূর এগোয়, পর্ষদ অতিরিক্ত দুই শতাংশ শেয়ার যোগ করার সিদ্ধান্ত নেয় কি না এবং তহবিলের অর্থ বাস্তবে কোন কোন অলাভজনক উদ্যোগ ও চাকরি-সংক্রান্ত কর্মসূচিতে যায়—এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই এই ঘোষণার প্রকৃত প্রভাব বোঝা যাবে।


