রাশিয়ার ভেতরে বসেই ইউক্রেনের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি, দুই রুশের বিরল স্বীকারোক্তি
রাশিয়ার ভেতরে বসেই ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করার বিরল বিবরণ দিয়েছেন দুই রুশ নাগরিক। নিজ দেশের সামরিক স্থাপনা ও কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে চালানো তৎপরতায় নিজেদের ভূমিকার কথা তাঁরা জানিয়েছেন, যা যুদ্ধের ছায়া-জগতের এক অদ্ভুত চিত্র তুলে ধরেছে।
দুজনের একজনকে এই প্রতিবেদনে ‘ইভান’ নামে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, রাশিয়ায় থেকেই তিনি কৌশলগত বোমারু বিমান ও গোলাবারুদ কারখানায় ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় ভূমিকা রেখেছেন। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের একটি প্রামাণ্যচিত্রে এই গুপ্তচরদের ছায়াময় জগতের কাহিনি উঠে এসেছে।
প্রামাণ্যচিত্রটি তৈরি করেছেন স্বাধীন পোলিশ সাংবাদিক মার্সিন মামোন। এতে আরেকজনকে ‘ফোমা’ নামে পরিচয় করানো হয়েছে—তিনি পোল্যান্ডে নির্বাসনে থাকা একজন রুশ নাগরিক। ফোমার দাবি, রাশিয়ার ভেতরে তিনি গোপন স্বেচ্ছাসেবীদের একটি নেটওয়ার্ক চালান।
ফোমার ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর নেটওয়ার্কের কাজ হলো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ওপর নজরদারি করা, যাদের ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জিইউআর লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করছে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, তাঁরা নিজেরা কখনো হামলায় অংশ নেন না—তাঁদের কাজ শুধু তথ্য দেওয়া।
কার কার ওপর নজরদারি চলছে, সে বিষয়ে ফোমা প্রথমে মুখ খুলতে চাননি। তবে গত ডিসেম্বরে মস্কোতে লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফানিল সারভারভ নিহত হওয়ার পর তিনি স্বীকার করেন, ওই কর্মকর্তার বিষয়ে তিনিই ইউক্রেনীয়দের গোয়েন্দা তথ্য দিয়েছিলেন। গাড়ির নিচে লুকিয়ে রাখা বিস্ফোরকে সারভারভ নিহত হন।
জিইউআর নিশ্চিত করেছে, ইভান ও ফোমা দুজনেই সংস্থাটির হয়ে কাজ করছেন। তবে সংস্থাটি এও স্বীকার করেছে, পুরো চিত্র তাদের জানা নেই। ইভানকে বিশ্বাস করা যায় কি না—এ প্রশ্নে তাঁর নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তার জবাব ছিল, ‘নিজেকে ছাড়া আর কাউকেই আমি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি না।’
দুই ব্যক্তি ও জিইউআর—উভয় পক্ষই বিস্তারিত তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক, ফলে তাঁদের দাবি করা তৎপরতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে তাঁরা যে কৌশলের কথা বলেছেন, তা ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে: কিয়েভ বলেছে, রাশিয়ার ভেতরে বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে সমন্বিত ড্রোন হামলা তাদের কৌশলের অংশ এবং এ কাজে তারা গোপন এজেন্ট ব্যবহার করে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ায় বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডও ঘটেছে। নীতি অনুযায়ী লক্ষ্যভিত্তিক হামলার দায় ইউক্রেন আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো স্বীকার করে না, যদিও একজন ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা এর আগে বিবিসিকে বলেছিলেন, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইগর কিরিলভ হত্যার পেছনে তারাই ছিল।
কতজন রুশ নাগরিক এ ধরনের কাজ করছেন, তা নিশ্চিত করা কঠিন। ফোমার ধারণা, সংখ্যাটি ৩০০ থেকে ৫০০-এর মতো—যদিও এটাও যাচাই করা সম্ভব নয়। দুজনেই বলেছেন, তাঁরা শুধু যুদ্ধের বিরোধী নন, প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের শাসনেরও বিরোধী, এবং তাঁদের বিশ্বাস, পুতিনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এই যুদ্ধের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে। ইভানের ভাষায়, ‘এই শাসন যদি যুদ্ধে হারে, তাহলে পতন হতে পারে… আমাদের কাজের মধ্য দিয়ে আমরা সেটাই ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করছি।’
ইভান জানান, তাঁর কাজ ছিল সামরিক স্থাপনায় নজরদারি এবং সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি হিসেবে ড্রোনের যন্ত্রাংশ লুকিয়ে রাখার জায়গা খুঁজে বের করা। তাঁর ভাষায়, এসব যন্ত্রাংশ একত্র করলেই তা ভয়ংকর অস্ত্রে পরিণত হয়, যা এক আঘাতে বহু মিলিয়ন ডলার মূল্যের স্থাপনা ধ্বংস করতে পারে। তিনি মামোনকে একটি ভিডিও পাঠিয়েছিলেন, যাতে দেখা যায়, তিনি একটি রুশ সামরিক বিমানঘাঁটির কাছে বিস্ফোরক লুকিয়ে রাখছেন। ধরা পড়লে তাঁর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে কয়েক দশকের কারাদণ্ড হতো।
ফোমার কাজের ধরন আলাদা—তিনি দূর থেকে অনলাইনে রাশিয়ার ভেতরের স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশিক্ষণ দেন। মামোন এমন একটি প্রশিক্ষণ দেখেছেন, যেখানে শেখানো হচ্ছিল কীভাবে নজরদারির জন্য চিহ্নিত জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাকে অনুসরণ করতে হয়। ফোমা তাঁর স্বেচ্ছাসেবীদের বলেন, লক্ষ্যব্যক্তির ছবি, জন্মতারিখ, বয়স, বর্ণনা ও গাড়ির তথ্যসহ একটি ফাইল দেওয়া হবে, আর লক্ষ্যের কাছে যাওয়ার সময় ফোন সঙ্গে না নিতে বলা হয়।
ফোমা দাবি করেন, রাশিয়ার ভেতরে, ইউক্রেনে ও ইউরোপের অন্যত্র মিলিয়ে তাঁর নেটওয়ার্কে প্রায় তিন ডজন মানুষ আছেন; রাশিয়ার বাইরের অংশটি লক্ষ্যব্যক্তিদের ডিজিটাল পদচিহ্ন খোঁজার মতো সহায়ক কাজ করে। তিনি বলেন, নজরদারির লক্ষ্য জিইউআরই প্রস্তাব করে, তবে তাঁর দল নিজেরা যাচাই করে দেখে ওই ব্যক্তিকে সামরিক অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা যায় কি না। তাঁর যুক্তি, পুতিন ও রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেনে যাঁরা ভয়ংকর কাজ করছেন, তাঁদের বুঝতে হবে এর মূল্য দিতে হবে—তাঁরা যেন ভয় পান।
ইভানের ঝুঁকি ছিল প্রত্যক্ষ। তিনি বলেন, সবচেয়ে গুরুতর ঘটনাটি ঘটেছিল যখন তাঁর গাড়ি তল্লাশির জন্য থামানো হয় আর তখন তাঁর কাছে হাতে তৈরি বিস্ফোরক ছিল—ঝুঁকি ছিল অত্যন্ত বেশি, কিন্তু তিনি ধরা পড়েননি। ধরা পড়ার ঝুঁকি কমাতে এই কাজে কোনো সুস্পষ্ট কাঠামো নেই বলে তিনি জানান; যাঁদের সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন, তাঁদের পরিচয়ও তিনি জানেন না, কখনো দেখাও হয়নি।
মামোনের যাচাই অনুযায়ী, গত জুনে ইয়েলাবুগায় রাশিয়ার সবচেয়ে বড় সামরিক ড্রোন কারখানায় হামলার পরিকল্পনায় ইভান জড়িত থাকতে পারেন—ওই ঘটনায় একজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছিল। ইভান জোর দিয়ে বলেছেন, বেসামরিক মানুষের ক্ষতি এড়ানোই সব সময় তাঁদের লক্ষ্য। প্রশ্ন রয়ে গেছে, তিনি কীভাবে বারবার রাশিয়া ছেড়ে বাইরে গিয়ে আবার ফিরে আসতে পেরেছেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, তৃতীয় কোনো দেশে ইউক্রেনীয় এজেন্টদের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে মিথ্যা শনাক্তকরণ পরীক্ষা (লাই ডিটেক্টর) দিতে হয়েছে।
দুজনের এই স্বীকারোক্তি যুদ্ধের এক অন্ধকার দিক উন্মোচন করেছে—যেখানে শত্রুদেশের ভেতরে বসেই নাগরিকরা বিপক্ষের গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করছেন। তবে এসব দাবির কতটা সত্য, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি, এবং জিইউআরের নিজের কর্মকর্তার কথাতেই স্পষ্ট, এই ছায়া-জগতে পূর্ণ আস্থা কারও ওপরই রাখা যায় না।





