ব্রাজিলে ফল মানতে নারাজ ফ্লাভিও বলসোনারো: ভোট বাতিলের ঘোষণা, পরিবহন-ব্যাঘাতে ফেডারেল পুলিশের তদন্ত
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রানঅফে হেরে ফল বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। ভোটের সময় বাড়ানোর শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তই ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে বলে তিনি দাবি করেছেন।
রোববারের রানঅফে বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা পেয়েছেন ৫১ শতাংশের বেশি ভোট, আর বলসোনারো পেয়েছেন ৪৮ শতাংশ। ৯৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ ব্যালট গণনা শেষে নির্বাচন কর্তৃপক্ষ লুলাকে বিজয়ী ঘোষণা করে।
এই জয় লুলার জন্য অভূতপূর্ব চতুর্থ মেয়াদ। আধুনিক ব্রাজিলের ইতিহাসে এর আগে কোনো প্রার্থী প্রথম রাউন্ডে দ্বিতীয় হয়ে রানঅফে জেতেননি। ৮০ বছর বয়সী লুলা গণতন্ত্রে ফেরার পর দেশটির সবচেয়ে বয়স্ক প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার নিজের রেকর্ডও ভাঙতে চলেছেন।
অথচ মাত্র তিন সপ্তাহ আগের চিত্র ছিল উল্টো। ৪ অক্টোবরের প্রথম রাউন্ডে বলসোনারো ৪৭ দশমিক ০৩ শতাংশ ভোট পেয়ে এগিয়ে ছিলেন; লুলা পেয়েছিলেন ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ—ব্যবধান ছিল ২২ লাখ ভোট। এরপর লুলা প্রথম রাউন্ডে ঘরে বসে থাকা ভোটারদের ফেরানো এবং জীবনযাত্রার ব্যয় ও তাঁর সামাজিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে প্রচারে জোর দেন।
রানঅফের শেষ ঘণ্টাগুলোতে দুই শিবিরই ভোটের সময় বাড়ানোর আবেদন করে। লুলার শিবিরের অভিযোগ ছিল, কয়েকটি শহরে স্থানীয় কর্মকর্তারা ইচ্ছাকৃতভাবে গণপরিবহন কমিয়ে দেওয়ায় নিম্ন আয়ের ভোটারদের কেন্দ্রে পৌঁছানো কঠিন হয়েছে।
ভারী বৃষ্টি ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ভোটারদের জন্য আরও সময় চেয়েছিল লুলার শিবির। মিনাস জেরাইসে আঞ্চলিক নির্বাচন আদালত জানায়, ৩৪৯টি ভোটকেন্দ্রে বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল, তবে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী ব্যাকআপ ব্যাটারিতে ভোটযন্ত্র চলতে থাকে।
ভোট মূলত শেষ হওয়ার কথা ছিল ব্রাসিলিয়া সময় বিকেল ৫টায় (জিএমটি ২০:০০)। দুই শিবিরের আবেদনের মুখে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ক্রিস্তিয়ানো জানিন ভোটকেন্দ্র রাত ৭টা (জিএমটি ২২:০০) পর্যন্ত আরও দুই ঘণ্টা খোলা রাখার নির্দেশ দেন।
তবে নির্দেশ আসার আগেই কিছু কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং সেগুলোর ইলেকট্রনিক ভোটযন্ত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পরে জানিন স্পষ্ট করেন, যেসব কেন্দ্র ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে সেগুলো বন্ধই থাকবে; শুধু খোলা থাকা কেন্দ্রগুলোই ৭টা পর্যন্ত ভোট নিতে পারবে। এতে কে তখনো ভোট দিতে পারবে তা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং বাড়ানো সময় সত্ত্বেও কিছু ব্রাজিলীয়কে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
নির্বাচন-পরবর্তী সংক্ষিপ্ত ভাষণে বলসোনারো এসব বিষয় তুলে ভোট বাতিলের কারণ হিসেবে দেখান। বিচারপতি জানিনের বিরুদ্ধে বিচারিক অসদাচরণের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘তিনি খেলার মাঝপথে খেলার নিয়ম বদলে দেন।’ সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এই নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়া অসম্ভব’ এবং পরিস্থিতিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দেন। তাঁর আদালতে চ্যালেঞ্জ করে পরাজয় উল্টে দেওয়ার চেষ্টা করার সম্ভাবনা রয়েছে।
ব্রাজিলের ফেডারেল পুলিশ পাঁচটি রাজ্যে নির্বাচন-সংক্রান্ত পরিবহন ব্যাঘাতের অভিযোগ তদন্ত করছে। সালভাদরে একটি আদালত শহরের পরিবহন সচিবের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছে; অভিযোগ, তিনি বাস সার্ভিস কমিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। লুলা শিবির এসব ঘটনাকে নির্বাচনে হস্তক্ষেপের প্রমাণ হিসেবে দেখাচ্ছে।
অন্যদিকে বলসোনারোও জানিনকে নিয়ে একই ধরনের অভিযোগ তুলেছেন; জানিন একসময় লুলার ব্যক্তিগত আইনজীবী ছিলেন এবং ২০২৩ সালে লুলাই তাঁকে সুপ্রিম কোর্টে মনোনীত করেন।
বিশ্বের ডানপন্থী মহল থেকেও বলসোনারোর পক্ষে সাড়া এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ভোটের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ব্রাজিলে কোনো রক্ষণশীল সরকার এমন করলে আমেরিকার মূলধারার সংবাদমাধ্যম সবাই ক্ষেপে উঠত, কিন্তু ‘কারণটা’ পক্ষে বলে তারা চুপ থাকতেই পছন্দ করছে। ট্রাম্প প্রশাসন বলসোনারো পরিবারকে সমর্থন দিয়ে এসেছে।
শনিবার রয়টার্স জানায়, ট্রাম্পের পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা লুলাকে দুর্বল করে বলসোনারো পরিবারকে ক্ষমতায় ফেরানোর চেষ্টার অংশ হিসেবে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। তবে রোববার কাকে জয়ী দেখতে চান জানতে চাইলে ট্রাম্প কোনো প্রার্থীর নাম বলেননি; সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি এতে জড়াতে চাই না, তবে আমরা দেখছি।’
আল-জাজিরার সংবাদদাতা মোনিকা ইয়ানাকিউয়ের মতে, ব্রাজিলের ডানপন্থীদের সঙ্গে দেশটির বিচার ব্যবস্থার টানাপোড়েন রোববারের ফলাফলের পর আবার সামনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের ভেতরের বিভক্তির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘বিচার ব্যবস্থা নিজেই খুব বিভক্ত; অনেক রাজনৈতিক সমঝোতার প্রয়োজন হবে।’
জরিপ প্রতিষ্ঠান অ্যাটলাসইন্টেলের প্রধান আন্দ্রেই রোমানের মতে, প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ভোটার উপস্থিতি লুলার জয়ে সাহায্য করে থাকতে পারে; ভোটে অনুপস্থিতি কমে যাওয়াকে তিনি জয়ের একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ৪ অক্টোবরের প্রথম রাউন্ডে প্রায় ৩ কোটি ৩৪ লাখ ব্রাজিলীয় ভোট দেননি—ভোটারদের প্রায় ২১ শতাংশ, যা ১৯৯৮ সালের পর সাধারণ নির্বাচনে সর্বোচ্চ অনুপস্থিতির হার।
বিজয়ী ভাষণে লুলা চতুর্থ মেয়াদের এই লড়াইয়ে ‘বাইরে থেকে আসা হস্তক্ষেপ কাটিয়ে ওঠার’ কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘এই নির্বাচন অস্বীকারবাদের পরাজয়; এটি মিথ্যার পরাজয়।’ ভাষণের শেষে সমর্থকদের ‘বাহিনী’র প্রশংসা করে তিনি বলেন, রাশিয়া, চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও এ দেশের গণতন্ত্রের বাহিনীর মতো বিজয়ী বাহিনী আছে কি না তা নিয়ে তাঁর গভীর সন্দেহ রয়েছে।


