কেপ টাউনের ‘জাদুর কলেজ’: সাধারণ শিশুদের আত্মবিশ্বাসী জাদুকরে বদলে দিচ্ছে আফ্রিকার একমাত্র জাদুবিদ্যালয়
গাঢ় মঞ্চে একা দাঁড়িয়ে ১১ বছরের লুবেলো মথেনজানা। পরনে ধারালো কালো থ্রি-পিস স্যুট, গলায় হলুদ বো টাই। নাম ঘোষণা হতেই দুই হাত ছড়িয়ে উজ্জ্বল হাসি দিয়ে সে বলল, ‘সবাইকে স্বাগতম! আমি লুবেলো মথেনজানা, আপনাদের জন্য পরিবেশন করব… জাদু!’
দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউনের কলেজ অব ম্যাজিকের বার্ষিক জুনিয়র জাদু প্রতিযোগিতার সেই মুহূর্তে প্রায় ৩০ শিশু ও অভিভাবকের দর্শকসারি মুগ্ধ হয়ে পড়ে। প্লাস্টিকের কাপে একগুচ্ছ পেপার ক্লিপ অদৃশ্য করে দেওয়ার পর সেগুলো দেশলাইয়ের বাক্সের ভেতর থেকে বের করে আনলে সবাই বিস্ময়ে হাঁ হয়ে যায়। আর শেষ চমক—শূন্য থেকে মিষ্টি বানিয়ে দর্শকের দিকে ছুড়ে দিতেই ফেটে পড়ে করতালি।
মেঘলা এক শনিবার সকালে কলেজটি ছিল প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর। কয়েক ডজন শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছিল বার্ষিক জুনিয়র জাদু প্রতিযোগিতায়। টপ হ্যাট, সাদা শার্ট ও টাই পরা শিশুরা রঙিন পোস্টারে সাজানো সিঁড়ি দিয়ে ছোটাছুটি করছিল। প্রতিটি তলার প্রদর্শনী আলমারিতে জাদুর কাঠি, ঝলমলে টুপি, সিল্কের রুমাল, হাতকড়া, ডাইস, রুবিকস কিউব, খেলনা, ছবি আর বিশ্বজুড়ে জেতা অসংখ্য ট্রফি।
পুরোনো লাল ইটের ভিক্টোরীয় প্রাসাদের বাইরে তালগাছের ছায়ায় দুই কিশোর ইউনিসাইকেল চালিয়ে ঘুরছিল। বারান্দায় কেউ বল, ক্লাব আর ডায়াবোলো নিয়ে জাগলিং অনুশীলন করছিল।
শান্ত এক পাড়ায় অবস্থিত এই অসাধারণ স্কুল যেন বাস্তবের হগওয়ার্টস—আফ্রিকার একমাত্র বিদ্যালয়, যেখানে তরুণ মঞ্চ-জাদুকর ও ভ্রমশিল্পীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রতি শনিবার সকালে ১০ থেকে ১৮ বছর বয়সী প্রায় ১৯০ জন শিক্ষার্থী এখানে পুতুলনাচ, মাইম, ক্লাউনিং, জাগলিং, তাসের খেলা, ভ্রম, মানসিক জাদু, মঞ্চ-জাদু, থিয়েটার প্রযোজনা ও বাঁধন থেকে মুক্তির কৌশল শেখে।
প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড গোরের ভাষায়, ‘ভালো জাদুকর হওয়ার জন্য যা যা দক্ষতা লাগে, তার সবই এখানে শেখানো হয়।’ শিক্ষার্থীদের অনেকে আসে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে; জাদু শেখার পাশাপাশি তারা আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা ও মানসিক দৃঢ়তা নিয়ে পৃথিবীর মুখোমুখি হতে শেখে।
১৯৮০ সালে গোর আইন পড়ছিলেন এবং ব্যক্তিগত জাদু অনুষ্ঠান করে নিজের খরচ চালাতেন। তখনই এক বন্ধুর সঙ্গে মিলে জাদুবিদ্যালয় খোলার ভাবনা আসে তার মাথায়।
গোর স্মরণ করেন, ‘আমরা টপ হ্যাট আর লেজকোট পরে স্থানীয় সংবাদপত্রের অফিসে গিয়ে আমাদের গল্প বললাম, সাংবাদিকদের জাদু দেখালাম, আর তারা একটি প্রতিবেদন ছাপল। সেই প্রতিবেদনের সূত্র ধরে ৩৪ জন তরুণ আনুষ্ঠানিক সাপ্তাহিক ক্লাসে যোগ দেয়।’
তখন দক্ষিণ আফ্রিকা ছিল বর্ণবৈষম্যের (অ্যাপার্টহাইড) কবলে—বর্ণের ভিত্তিতে প্রায় সবকিছুই ছিল কঠোরভাবে আলাদা। রাষ্ট্রীয় বিদ্যালয়গুলো ছিল সম্পূর্ণ পৃথক; ভিন্ন বর্ণের শিক্ষার্থীরা একই বেঞ্চ, একই প্রবেশদ্বার এমনকি একই গণপরিবহনও ব্যবহার করতে পারত না। অথচ কলেজ অব ম্যাজিক প্রথম দিন থেকেই ছিল বহুজাতিক।
গোর বলেন, ‘শুরুতে আমাদের প্রতিষ্ঠানটি ছিল আইনবিরোধী’—বর্ণভেদ না মানার নীতির কারণেই। ‘এটি ছিল সব পটভূমির তরুণদের এক অভিন্ন আগ্রহের চারপাশে একত্র হওয়ার, একে অপরকে জানার ও বোঝার সুযোগ।’
প্রায় পাঁচ দশক পরেও বিদ্যালয়টি বর্ণ ও অর্থনৈতিক বিভাজনে বিভক্ত শহর কেপ টাউনে আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গোর বলেন, ‘আমাদের অনেক তরুণ এখনো নিজ নিজ আর্থসামাজিক গণ্ডিতে আটকে থাকে, প্রায়ই ভাষা বা বর্ণের সীমারেখায়। কেউ আসে দামি গাড়িতে, কেউ আসে এক ঘণ্টা ধরে সম্মিলিত ট্যাক্সিতে চড়ে। কিন্তু এখানে এলে তারা একই সরঞ্জাম, একই ক্লাস, একই মঞ্চ ব্যবহার করে এবং একই খাবার খায়।’
১৭ বছরের সিবাবালওয়ে সিবাজ ইউনিসাইকেলে চড়ে জাগলিং করে; ১১ বছরের লুবেলোর আগুনের খেলা দর্শককে মন্ত্রমুগ্ধ করে। কয়েক দশকে এই কলেজ প্রশিক্ষণ দিয়েছে হাজার হাজার জাদুকর, ভ্রমশিল্পী ও পরিবেশনশিল্পীকে।
সব মিলিয়ে, কলেজ অব ম্যাজিক শুধু খেলা শেখায় না—এটি বিভক্ত সমাজের শিশুদের এক মঞ্চে এনে আত্মবিশ্বাসী, সৃজনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে আছে।





