যবিপ্রবির তরল ন্যানো ইউরিয়া মাঠে পৌঁছানোর অপেক্ষায়: ৫০০ মিলিলিটারেই এক বস্তা সারের বিকল্পের দাবি গবেষকদের
বিশ্বজুড়ে সারের সংকট আর আমদানি খরচ বাড়ার সময়ে দেশীয় গবেষণা থেকে একটি বিকল্প সমাধানের আশা জাগিয়েছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) একটি গবেষণাগার। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ‘ন্যানো-বায়ো অ্যান্ড অ্যাডভান্সড মেটেরিয়ালস ইঞ্জিনিয়ারিং’ (NAME) ল্যাব ন্যানো প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করছে, যা ফসল উৎপাদন ও শস্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে গবেষণাগারের উদ্ভাবন কৃষকের মাঠে পৌঁছে দিতে কার্যকর নীতিমালা ও সরকারি উদ্যোগ দরকার।
ল্যাবটির নেতৃত্বে আছেন অধ্যাপক ড. মো. জাভেদ হোসেন খান। তার নেতৃত্বেই ২০১৩ সালে NAME ল্যাব প্রতিষ্ঠিত হয়। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী এটি বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র আইএসও সনদপ্রাপ্ত ন্যানো গবেষণাগার। এক যুগের বেশি সময়ের গবেষণা ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে ল্যাবটিকে আন্তর্জাতিক মানে তোলা হয়েছে, আর ড. খানকে দেশের ন্যানোপ্রযুক্তি গবেষণার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে দেখা হয়। ২০২৬ সালে তিনি বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের ফেলো নির্বাচিত হন।
২০১৯ সাল থেকে অধ্যাপক খান ও তার দল ন্যানো সার নিয়ে ধারাবাহিক গবেষণা চালিয়ে আসছেন। তাদের দাবি, দেশে প্রথমবারের মতো তারা তরল ন্যানো ইউরিয়া উদ্ভাবন করেছেন। গবেষকদের মতে, মাত্র ৫০০ মিলিলিটার তরল ন্যানো ইউরিয়া প্রচলিত ৫০ কেজির এক বস্তা দানাদার ইউরিয়ার বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে।
মাঠপর্যায়ে বিস্তৃত পরীক্ষায় এই কার্যকারিতা প্রমাণিত হলে সার ব্যবহার, পরিবহন ও সংরক্ষণের খরচ অনেক কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং পানিতে অতিরিক্ত নাইট্রোজেন দূষণ কমাতেও এটি সাহায্য করতে পারে বলে গবেষকরা আশা করছেন।
তবে গত কয়েক বছরে এই উদ্ভাবন নিয়ে গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও তরল ন্যানো ইউরিয়া এখনো বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করা সম্ভব হয়নি। উদ্ভাবন আর কৃষকের ব্যবহারের মধ্যে এই দীর্ঘ দূরত্বই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
গত সেপ্টেম্বরে আয়োজিত বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬-এ প্রধানমন্ত্রী ড. জাভেদ হোসেন খানের ন্যানো ইউরিয়া প্রকল্পটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। সে সময় তিনি গবেষক দলকে প্রযুক্তিটির উন্নয়ন ও প্রয়োগে সরকারের পক্ষ থেকে সার্বিক সহায়তার আশ্বাস দেন। এখন উদ্ভাবক ও কৃষিসংশ্লিষ্টরা সেই আশ্বাস অনুযায়ী ইতিবাচক সিদ্ধান্ত ও কার্যকর উদ্যোগের অপেক্ষায় আছেন।
কিন্তু আশ্বাসের বিপরীতে বাংলাদেশে ন্যানো-কৃষিপ্রযুক্তি নিয়ে এখনো কোনো জাতীয় নীতিমালা নেই। নিরাপত্তা পরীক্ষা, নিবন্ধন, অনুমোদন ও বাজারজাতকরণের সুনির্দিষ্ট কাঠামো না থাকায় অনেক গবেষণার ফল মাঠে কৃষকের কাছে পৌঁছাতে পারছে না। সার সংকট মোকাবিলায় সরকার যখন বিকল্প উৎস খুঁজছে, তখন ন্যানোপ্রযুক্তিভিত্তিক কৃষি উদ্ভাবনকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
NAME ল্যাবের কাজ শুধু সার উদ্ভাবনে সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজন মেটাতে বিভিন্ন রাসায়নিক ফর্মুলেশনও তৈরি করছে ল্যাবটি, যাতে আমদানিনির্ভরতা কমে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ‘হিট’ (HEAT) প্রকল্পের আওতায় এখানে ন্যানো-কীটনাশক নিয়েও গবেষণা চলছে, যার লক্ষ্য ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার অন্তত ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনা।
শাকসবজি ও ফলে কীটনাশকের বিষাক্ত অবশিষ্টাংশ, কৃষকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং উপকারী পতঙ্গ ও জলাশয়ের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে স্বল্প মাত্রায় কার্যকর ন্যানো-কীটনাশক নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণাগারের উদ্ভাবন যেন সেখানেই আটকে না থেকে জাতীয় পর্যায়ে সুফল আনে, সে জন্য কয়েকটি উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। প্রথমত, জৈব নিরাপত্তা, মান নিয়ন্ত্রণ, লেবেলিং ও বাণিজ্যিক অনুমোদনের সুস্পষ্ট বিধান রেখে দ্রুত একটি জাতীয় ন্যানো-কৃষি নীতিমালা প্রণয়ন করা। দ্বিতীয়ত, কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যৌথ উদ্যোগে প্রধান শস্যের ওপর স্বাধীন মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা চালিয়ে কার্যকারিতা যাচাই ও ফলাফল স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা।
তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রযুক্তি হস্তান্তরের স্পষ্ট নিয়ম তৈরি করে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব গড়ে তোলা। চতুর্থত, পরীক্ষামূলক উৎপাদন সুবিধা ও স্বীকৃত পরীক্ষাগার স্থাপনে বিনিয়োগ বাড়ানো। পঞ্চমত, ন্যানো সার সঠিক মাত্রায় ব্যবহারের জন্য কৃষক ও কৃষি সম্প্রসারণকর্মীদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা।
ড. জাভেদ হোসেন খান বলেছেন, দেশীয় উদ্ভাবনকে মাঠপর্যায়ে নিয়ে যেতে সরকার কার্যকর নীতিমালা করলে গবেষকদের পক্ষে কৃষকদের কাছে উদ্ভাবিত পণ্য পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে। তিনি আরও বলেছেন, ইনোভেশন ফেয়ারে প্রধানমন্ত্রী নিজে তাদের উদ্ভাবিত ন্যানো ইউরিয়া দেখেছেন এবং প্রযুক্তির অগ্রগতি ও প্রয়োগে সরকারের সার্বিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন; এখন তারা উদ্ভাবক ও কৃষিসংশ্লিষ্ট বিভাগের ইতিবাচক সিদ্ধান্ত ও কার্যকর উদ্যোগের অপেক্ষায় রয়েছেন।
বছরের পর বছর নিষ্ঠার সঙ্গে দেশের কৃষি খাতের উন্নয়নে কাজ করে যাওয়া ড. খানের নেতৃত্বাধীন NAME ল্যাবকে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্ব যখন দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে, তখন দেশের নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের পর গবেষক ও কৃষিসংশ্লিষ্টদের আশা, তরল ন্যানো ইউরিয়া মাঠে পৌঁছানোর দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান শিগগিরই হবে।






