তিন দিন পর সচল বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট, সাইবার হামলার চিহ্ন মেলায় চালু করা যায়নি জনতা ব্যাংকেরটি
সাইবার হামলার সম্ভাব্য ঝুঁকি যাচাইয়ের জন্য তিন দিন বন্ধ রাখার পর আবার চালু হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট। রোববার (২৫ অক্টোবর) সকাল ৮টা থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা যাচ্ছে। তবে একই দিনে চালু করা সম্ভব হয়নি রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের ওয়েবসাইট — সেখানে অন্তত দুটি স্থানে সাইবার হামলার চিহ্ন শনাক্ত হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ছুটি শেষে রোববার সকালে সেটি আবার সাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সংবাদমাধ্যমকে জানান, ওয়েবসাইটে কোনো ত্রুটি রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা হয়েছিল। বিশ্বজুড়ে সাইবার হামলার আশঙ্কা থেকে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে সাইটটি বন্ধ রাখা হয়। ঝুঁকি কেটে যাওয়ায় এটি আবার চালু করা হয়েছে।
অন্যদিকে বৈশ্বিক সতর্কতার পরিপ্রেক্ষিতে ঝুঁকি এড়াতে আগেই বন্ধ রাখা হয়েছিল জনতা ব্যাংকের ওয়েবসাইটও। এরপরও সাইবার হামলার শিকার হয়েছে সেটি। অন্তত দুটি স্থানে স্প্যাম বা সাইবার হামলার চিহ্ন শনাক্ত হওয়ার পর সেগুলো ঠিক করতে কাজ করছেন ব্যাংকটির তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের কর্মীরা।
রোববার ছুটির পর ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হলেও বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের ওয়েবসাইটটি চালু করা সম্ভব হয়নি। ব্যাংকটির আইটি বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, ওয়েবসাইটের দুটি স্থানে সাইবার হামলার আলামত পাওয়া গেছে। ত্রুটিগুলো শনাক্ত করে ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা পুনরুদ্ধারে কাজ চলছে। আজকের মধ্যেই ওয়েবসাইটটি পুরোপুরি নিরাপদ করে সচল করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তাঁরা।
জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ শূন্য থাকায় এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। গত ১৯ অক্টোবর জনতা ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবুর রহমানের নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করে সরকার। এর পরদিন থেকে দুর্গাপূজা ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে ব্যাংক খাতে টানা পাঁচ দিনের ছুটি শুরু হয়।
এই পুরো পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে বিশ্বজুড়ে বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে শনাক্ত হওয়া দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি। এই ত্রুটি শনাক্তের পর বৈশ্বিক সাইবার হামলার আশঙ্কায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা এনিসা ও সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো গত ২১ অক্টোবর যৌথ সতর্কতা জারি করে।
সতর্কবার্তায় বলা হয়, এই ত্রুটির সুযোগ নিয়ে হ্যাকাররা আক্রান্ত সার্ভারে দূর থেকে ক্ষতিকর কোড চালাতে পারে। দ্রুত সিকিউরিটি প্যাচ বা হালনাগাদ দেওয়া সম্ভব না হলে ঝুঁকিপূর্ণ অ্যাপ্লিকেশনগুলো সাময়িকভাবে ইন্টারনেট সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
সেই সতর্কতার অংশ হিসেবে বাড়তি সুরক্ষার তাগিদে গত বৃহস্পতিবার থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংক ও জনতা ব্যাংকের ওয়েবসাইট সাধারণের জন্য সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছিল। ছুটি শেষে রোববার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পোর্টাল যথারীতি চালু করা হলেও জনতা ব্যাংকের ওয়েবসাইটে ম্যালওয়্যার সংক্রমণের কারণে সেটি আর চালু করা সম্ভব হয়নি।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর বিভিন্ন দেশের সরকার জরুরি পদক্ষেপ নেয়। ত্রুটির বিষয়টি সামনে আসার পর গত বুধবার রাত থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার ঘটনা ঘটে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরও বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ হ্যাকিংয়ের চেষ্টা হয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে।
স্বস্তির বিষয় হলো, ওয়েবসাইট বন্ধ থাকলেও এ সময়ে ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন স্বাভাবিক ছিল। ফলে গ্রাহকদের আর্থিক লেনদেনে কোনো বিঘ্ন ঘটেনি।
বর্তমানে সরকারি সেবা, ব্যাংকিং কার্যক্রম, ই-কমার্স, সংবাদমাধ্যমসহ নানা ধরনের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পরিচালনায় ওয়েবসাইট ও সফটওয়্যারের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। এসব ওয়েবসাইটের বড় একটি অংশ তৈরিতে ব্যবহৃত হয় পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষা। ফলে একটি ভাষার নিরাপত্তা ত্রুটিই একসঙ্গে বহু প্রতিষ্ঠানকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে — এবারের ঘটনা তা আবারও সামনে এনেছে।
এখন সবার নজর জনতা ব্যাংকের দিকে। ব্যাংকটির আইটি বিভাগ দুটি ত্রুটি সারিয়ে ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা পুনরুদ্ধারে কাজ করছে। আজকের মধ্যে সাইটটি নিরাপদ করে সচল করার আশা করা হলেও, চূড়ান্তভাবে চালু না হওয়া পর্যন্ত গ্রাহকদের অপেক্ষা করতে হবে।




