ই-বর্জ্যের পাহাড়ে বাংলাদেশ: আইন আছে, বাস্তবায়ন নেই — বৈশ্বিক অভিজ্ঞতায় খুঁজতে হবে পথ
স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, টেলিভিশন আর ফ্রিজ — আধুনিক জীবনের অপরিহার্য এসব পণ্য ব্যবহারের মেয়াদ শেষ হলে কিংবা নষ্ট হয়ে গেলে সেগুলোর নিরাপদ ব্যবস্থাপনা এখন বড় পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ। ব্যবহারের অনুপযোগী পুরোনো ও অকার্যকর বৈদ্যুতিক এবং ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি থেকে সৃষ্ট এই বর্জ্যই ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা ই-বর্জ্য।
ই-বর্জ্যের মধ্যে তামা, লোহা, অ্যালুমিনিয়াম ও সোনার মতো মূল্যবান উপাদান যেমন রয়েছে, তেমনি কিছু পণ্যে সিসা, পারদ ও ক্যাডমিয়ামসহ ক্ষতিকর পদার্থও থাকতে পারে। পুরোনো যন্ত্রপাতি ভাঙা, পোড়ানো কিংবা অনিরাপদ পদ্ধতিতে পুনর্ব্যবহারের ফলে এসব ক্ষতিকর উপাদান মাটি, পানি ও বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এর ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের স্বাস্থ্যও ঝুঁকির মুখে পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, অনিরাপদ ই-বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে সৃষ্ট দূষণ বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অথচ ই-বর্জ্যকে শুধু আবর্জনা হিসেবে না দেখে সঠিক প্রযুক্তি ও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ থেকে মূল্যবান ধাতু, প্লাস্টিক ও অন্যান্য উপাদান পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। ফলে কার্যকর ব্যবস্থাপনা পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আমদানি নির্ভরতা হ্রাস এবং সম্পদের দক্ষ ব্যবহারে অবদান রাখতে পারে।
বৈশ্বিক চিত্রটাও উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ) এবং জাতিসংঘের প্রশিক্ষণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ‘দ্য গ্লোবাল ই-ওয়েস্ট মনিটর ২০২৪’ অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ টন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হয়েছিল। এর মাত্র ২২ দশমিক ৩ শতাংশ আনুষ্ঠানিকভাবে সংগ্রহ ও পরিবেশসম্মত উপায়ে পুনর্ব্যবহারের নথিভুক্ত হিসাবের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
একই প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, প্রচলিত ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে বিশ্বে ই-বর্জ্যের পরিমাণ ৮ কোটি ২০ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। বাংলাদেশেও ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও জীবনচক্র শেষে সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার ও নিরাপদ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা এখনো পর্যাপ্ত নয়।
বাংলাদেশে একটি আইনগত কাঠামো অবশ্য রয়েছে — ২০২১ সালের ১০ জুন প্রকাশিত ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা। এতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দায়িত্ব, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে এবং উৎপাদকের সম্প্রসারিত দায়বদ্ধতার ধারণাও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু বিধিমালা থাকা সত্ত্বেও কার্যকর বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ২০২৫ সালের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ই-বর্জ্যের প্রকৃত উৎপাদন ও পুনর্ব্যবহারের নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্য নেই। প্রতিবেদনে পরিবেশ অধিদপ্তরের জন্য বুয়েটের মাধ্যমে পরিচালিত ২০১৭ সালের একটি সমীক্ষার বরাত দিয়ে উল্লেখ করা হয়, দেশে বছরে আনুমানিক ১ কোটি ৩৩ লাখ কেজি ই-বর্জ্য উৎপন্ন হতো, এর প্রায় ৩ শতাংশ পুনঃপ্রক্রিয়াজাত ও রপ্তানি করা হতো এবং সংগ্রহের ৯৭ শতাংশই ছিল অনানুষ্ঠানিক খাতনির্ভর।
বাস্তবে পুরোনো মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন, ব্যাটারি ও গৃহস্থালি যন্ত্রপাতির একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রাহক ও ভাঙারির ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে পুনর্ব্যবহারের জন্য বিক্রি হয়। এতে কিছু উপাদান পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হলেও অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশ ও শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনুমোদিত পুনর্ব্যবহারকারীদের জন্য পর্যাপ্ত বর্জ্য সংগ্রহ, বিনিয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তাও জরুরি।
বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা এখানে পথ দেখাতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে বর্জ্য বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জামের নির্দেশিকার আওতায় সদস্য দেশগুলোকে ই-বর্জ্য পৃথকভাবে সংগ্রহ, যথাযথ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হয়; উৎপাদক ও আমদানিকারকদেরও বাজারজাত পণ্যের ব্যবস্থাপনায় আর্থিক বা সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করতে হয়, আর ইউরোপীয় কমিশন অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে।
জাপানের মতো অনেক দেশে পুরোনো ইলেকট্রনিক পণ্য সংগ্রহের দায়িত্ব উৎপাদক, আমদানিকারক ও বিক্রেতাদের সঙ্গে ভাগ করে দেওয়া হয় — ক্রেতারা নতুন পণ্য কেনার সময় পুরোনো সমজাতীয় পণ্য ফেরত দিতে পারেন। দক্ষিণ কোরিয়ায় উৎপাদকদের সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা আছে; তা পূরণ না করলে জরিমানা পুনর্ব্যবহারের খরচের চেয়েও বেশি হয়। ভারতেও উৎপাদক দায়বদ্ধতার নিয়ম হালনাগাদ করে অনানুষ্ঠানিক খাতকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় আনার চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশের জন্য করণীয় হিসেবে কয়েকটি উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে — বিধিমালার বাস্তবায়ন জোরদার করে উৎপাদক, আমদানিকারক, বিক্রেতা, সংগ্রাহক ও পুনর্ব্যবহারকারীদের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে কার্যকর করা; সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, বিশ্ববিদ্যালয়, বিপণিবিতান ও ইলেকট্রনিক পণ্যের দোকানে দেশব্যাপী সংগ্রহকেন্দ্র গড়ে তোলা; এবং উৎপাদকের সম্প্রসারিত দায়বদ্ধতা সত্যিকার অর্থে কার্যকর করা।
এর পাশাপাশি নিরাপদ পুনর্ব্যবহারশিল্প গড়ে তোলা, অনানুষ্ঠানিক খাতের সংগ্রাহক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও অনুমোদিত কেন্দ্রের সঙ্গে সংযোগ দিয়ে ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা এবং জনসচেতনতা ও গবেষণা বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। পুরোনো ফোন, কম্পিউটার বা ব্যাটারি সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে না ফেলে অনুমোদিত সংগ্রহকেন্দ্রে জমা দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলাই হতে পারে সেই পরিবর্তনের শুরু।




