সেতুর নিচে অচেতন অবস্থায় মিলল শ্রীমঙ্গলের মাদরাসাশিক্ষক, হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু; রহস্যের তদন্ত দাবি পরিবারের
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের এক মাদরাসাশিক্ষকের রহস্যজনক মৃত্যুতে এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। শ্রীমঙ্গলের জামেয়া লুৎফিয়া আনোয়ারুল উলুম হামিদ নগর বরুণা মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা শাহ মনিরুজ্জামান জসিম মারা গেছেন। পরিবারের অভিযোগ, দুষ্কৃতকারীরা তাঁকে কোনো চেতনানাশক খাইয়ে ভৈরব-আশুগঞ্জ সেতুর নিচে ফেলে রেখে যায়। মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
শনিবার রাত ১০টায় মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নিহতের ভাতিজা মুস্তাকিম আল মুনতাজ তালুকদার। নিহত মাওলানা জসিম শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালাপুর ইউনিয়নের ভৈরবগঞ্জবাজার মাজদিহী এলাকার আব্দুল ওয়াহিদের ছেলে। তিনি চার কন্যাসন্তানের জনক ছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে বরুণা মাদরাসায় শিক্ষকতা করে আসছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে পরিবার, সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, মাওলানা জসিম শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভৈরব বাজার এলাকার বাসায় থাকতেন। শুক্রবার বিকেল থেকে তিনি নিখোঁজ হন। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে মনে করেছিলেন, তিনি হয়তো মাদরাসাতেই আছেন। কিন্তু সময় গড়ালেও তাঁর কোনো খোঁজ মেলেনি। কীভাবে তিনি মৌলভীবাজার থেকে ভৈরব-আশুগঞ্জ এলাকায় পৌঁছালেন, তা পরিবারের কাছেও রহস্যই রয়ে গেছে।
পরিবারের ধারণা, ওই সময় কে বা কারা তাঁকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গিয়ে অচেতন করে ভৈরব-আশুগঞ্জ সেতুর নির্জন এলাকায় ফেলে রেখে যায়। তাঁর শরীরে দৃশ্যমান কোনো রক্তাক্ত জখম বা শারীরিক নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ফলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, চেতনানাশক কোনো বস্তু খাইয়ে বা স্প্রে করে তাঁকে অচেতন করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি প্রথম সামনে আসে স্থানীয় কয়েকজন যুবকের মাধ্যমে। তাঁরা মাওলানা জসিমকে অচেতন ও আশঙ্কাজনক অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে দ্রুত ভৈরবের একটি হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করান। অচেনা এক মানুষের প্রতি তাঁদের এই মানবিক উদ্যোগই শেষ পর্যন্ত তাঁর পরিচয় শনাক্তের পথ খুলে দেয়, যদিও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো যায়নি।
বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পেছনেও ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। স্থানীয় বিএনপি নেতা ও ইউপি চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী এবাদুর রহমান মোশাহিদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মুমূর্ষু মাওলানা জসিমের একটি ভিডিওচিত্র ফেসবুকে পোস্ট করেন। সেই ভিডিওর সূত্র ধরেই পরিবারের সদস্যরা উদ্ধারকারী যুবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনার বিস্তারিত জানতে পারেন। ভাতিজা মুস্তাকিম আল মুনতাজ তালুকদার বলেন, ফেসবুকে ভিডিও দেখেই তাঁরা বিষয়টি জানতে পারেন।
খবর পাওয়ার পরপরই বরুণা মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা আহমদ জুবায়ের জুয়েলসহ পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা দ্রুত ভৈরবের উদ্দেশে রওনা হন। তাঁরা হাসপাতালে গিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করেন। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে অন্য একটি হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু পথেই গাড়ির মধ্যে তাঁর মৃত্যু হয়। ফলে উন্নত চিকিৎসার সেই চেষ্টা আর সফল হয়নি।
এই মৃত্যু ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো দূরত্ব ও সময়ের হিসাব। শ্রীমঙ্গল থেকে ভৈরব-আশুগঞ্জ সেতু এলাকার দূরত্ব অনেকটা। শুক্রবার বিকেলে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে সেতুর নিচে অচেতন অবস্থায় পাওয়া পর্যন্ত সময়টুকুতে ঠিক কী ঘটেছিল, কারা তাঁকে সেখানে নিয়ে গেল এবং কেন — এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। তাঁর পরিচিতজনেরা ঘটনাটি তদন্ত করে প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করার দাবি জানিয়েছেন।
ভাতিজা মুস্তাকিম আল মুনতাজ তালুকদারের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার থেকে নিখোঁজ থাকলেও পরিবার প্রথমে ভেবেছিল তিনি মাদরাসায় আছেন। দুপুরে ফেসবুকে ভিডিও দেখে তাঁরা প্রথম বিষয়টি জানতে পারেন। ভৈরবের হাসপাতাল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে তিনি জানান। পরিবারের এই ভাষ্য ঘটনার সময়রেখাকে আরও স্পষ্ট করলেও রহস্যের মূল প্রশ্নগুলো অমীমাংসিতই থেকে গেছে।
নিহতের পরিবার ও স্থানীয় এলাকাবাসী এই রহস্যজনক ঘটনার সুষ্ঠু ও নিবিড় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উন্মোচন করে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। চার কন্যাসন্তানকে রেখে যাওয়া একজন শিক্ষকের এমন মৃত্যুতে এলাকায় শোকের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, তদন্তে শুক্রবার বিকেল থেকে শনিবার পর্যন্ত সময়ের ঘটনাপ্রবাহ কতটা স্পষ্ট হয়।




