দেশে প্রথম ব্যাংক হিসেবে ১ হাজার কোটি টাকার গ্রিন বন্ড ছাড়ছে ব্র্যাক ব্যাংক
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে নতুন একটি অধ্যায় যোগ করতে যাচ্ছে ব্র্যাক ব্যাংক। দেশের ‘প্রথম ব্যাংক’ হিসেবে ১ হাজার কোটি টাকার গ্রিন বন্ড ছাড়তে যাচ্ছে ব্যাংকটি। ব্যাংক সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে। এর মধ্য দিয়ে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বড় অঙ্কের তহবিল সংগ্রহের একটি আনুষ্ঠানিক পথে পা রাখছে দেশের একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক।
ব্যাংকটি জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন বন্ড নীতিমালা মেনেই এই বন্ড ছাড়া হবে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত কাঠামো ও শর্তের মধ্যেই তহবিল সংগ্রহ ও তার ব্যবহার পরিচালিত হবে। এই বন্ডের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ কোথায় ব্যয় হবে, তাও আগেই নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বন্ড থেকে পাওয়া অর্থ ব্যয় করা হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে, পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণে এবং শিল্প খাতে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর নানা উদ্যোগে। ফলে তহবিলটি সাধারণ ঋণ কার্যক্রমে নয়, বরং পরিবেশগতভাবে টেকসই খাতেই ব্যবহারের কথা বলছে ব্যাংকটি।
গ্রিন বন্ড মূলত এমন একটি আর্থিক মাধ্যম, যার মাধ্যমে পরিবেশগতভাবে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্পের জন্য তহবিল সংগ্রহ করা হয়। একই সঙ্গে এটি বিনিয়োগকারীদের নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা দেয়। অর্থাৎ পরিবেশ-লক্ষ্য আর বিনিয়োগকারীর আয় — দুটোকে একসঙ্গে রাখার একটি কাঠামো হিসেবেই বিশ্বজুড়ে গ্রিন বন্ড পরিচিত।
গত ২৩ মে প্রকাশিত এক ডিসক্লোজারে জানানো হয়, ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি তাদের পরিবেশবান্ধব অর্থায়ন কার্যক্রমে সহায়তার জন্য অভিহিত মূল্যে (ফেস ভ্যালু) সর্বোচ্চ ১ হাজার কোটি টাকার গ্রিন বন্ড ছাড়ার পরিকল্পনা করেছে। সেই ঘোষণার ধারাবাহিকতাতেই এখন বন্ডটি ছাড়ার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে।
এর দুই দিন আগে অনুষ্ঠিত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এই বন্ড ছাড়ার বিষয়টি অনুমোদন পায়। পর্ষদের অনুমোদন ও পরে ডিসক্লোজারের মধ্য দিয়ে বিষয়টি বিনিয়োগকারী ও বাজারের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হয়।
তথ্য অনুযায়ী, তিন বছর মেয়াদি এই বন্ডটি হবে রূপান্তর-অযোগ্য (নন-কনভার্টেবল) এবং মেয়াদ শেষে সম্পূর্ণ পরিশোধযোগ্য (ফুললি রিডিমেবল)। এর অর্থ, বন্ডটিকে শেয়ারে রূপান্তর করা যাবে না এবং মেয়াদ শেষে তা পুরোপুরি পরিশোধ করা হবে — এই কাঠামো আগেই বিনিয়োগকারীদের জন্য স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
ব্র্যাক ব্যাংকের নিজেদের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন প্রকল্পে বিশেষ অর্থায়ন সুবিধা দিয়ে থাকে ব্যাংকটি। এর মধ্যে রয়েছে সৌর ও বায়ু শক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি উদ্যোগ, জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ এবং ইটিপি (বর্জ্য শোধনাগার) সুবিধার মাধ্যমে দায়িত্বশীল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। গ্রিন বন্ডের লক্ষ্য খাতগুলোর সঙ্গে ব্যাংকটির বিদ্যমান এই কার্যক্রমের মিল রয়েছে।
এটি ব্র্যাক ব্যাংকের জন্য এ ধরনের বড় বন্ডের প্রথম অভিজ্ঞতা নয়। এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশের প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১ হাজার কোটি টাকার একটি ‘সোশ্যাল বন্ড’ ছাড়ার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পেয়েছিল ব্যাংকটি। সেই বন্ড থেকে পাওয়া অর্থ ব্যাসেল-৩ কাঠামোর অধীনে ব্যাংকের টায়ার-২ মূলধন শক্তিশালী করতে এবং সামাজিক উন্নয়নে ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
সোশ্যাল বন্ডের পর এবার গ্রিন বন্ড — দুটি ক্ষেত্রেই ১ হাজার কোটি টাকার অঙ্কটি দেশের ব্যাংক খাতে বড় একটি সংখ্যা। সামাজিক লক্ষ্যের বন্ডের পর পরিবেশ-লক্ষ্যের বন্ড ছাড়ার এই ধারাবাহিকতা ব্যাংকটির টেকসই অর্থায়নের দিকে ঝোঁককেই স্পষ্ট করে।
বিশ্লেষণের দিক থেকে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব ভবন ও শিল্পে জ্বালানি দক্ষতা — এই তিন খাতই দেশের জ্বালানি ও পরিবেশ নীতির আলোচনায় বারবার উঠে আসে। ব্যাংকের বন্ড থেকে সংগৃহীত অর্থ ঠিক সেই খাতগুলোতেই যাওয়ার কথা বলা হয়েছে, ফলে বন্ডটির বাস্তব প্রয়োগের দিকে বাজারের নজর থাকবে।
এখন বন্ডটি ছাড়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ও বিনিয়োগকারীদের সাড়াই ঠিক করবে এই উদ্যোগ কত দ্রুত মাঠে গড়ায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা মেনে ছাড়া এই ১ হাজার কোটি টাকার গ্রিন বন্ড সফলভাবে সংগৃহীত হলে তা দেশের অন্য ব্যাংকগুলোর জন্যও পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।



